১ লা মে বিশ্ব শ্রমিক সংহতি দিবস
ইতিহাসের পাঠ্যসূচি
জিন্না আহমেদ
কিভাবে পড়বেন? অবশ্যই বই থেকে এবং জীবন থেকে। প্রতি মুহূর্তের জীবনাভিজ্ঞতা আপনাকে কিছু না কিছু শেখায়। আপনি যখন ভরা তারুণ্যে জীবন উপভোগ করছিলেন তখন নিশ্চয়ই ছোটখাটো অসুখ-বিসুখ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তারপর বয়স বাড়লো। সামান্য সর্দিকাশিতেও আপনি নাজেহাল। জীবনচক্রের এটাই শাশ্বত ভবিতব্য। এই ভবিতব্যের গেড়োতেই আটকে গেছে পুঁজিবাদের জীবনচক্র। বিশ্ব-পুঁজিবাদ সেই কবে তার যৌবনের দ্যুতি অতিক্রম করে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেছে। এখন ব্যাধি-বিধ্বস্ত পুঁজিবাদ আছে ভ্যান্টিলেশনে।
একটু খেয়াল করে দেখুন। পুঁজির যৌবনের কালে তার প্রমোদবিহারের সময় বেশ কিছু উপঢৌকনের প্রাপ্তি ঘটেছিল নিপীড়িতের কপালে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই এটুকু বোঝা যায়, পুঁজির বিকাশের যুগেই একের পর এক গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ। আরো ভেঙে বলা যায়, নিরন্তর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পুঁজির বিকাশের যুগে একের পর এক শ্রম-অধিকার আদায় করে তাকে অনুকূল শ্রম-আইনে পরিণত করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল শ্রমজীবী মানুষ। সেই সব অধিকারের তালিকা দীর্ঘ। নির্বাচনী আইন সংস্কার, মহিলা ভোটাধিকার, আট ঘন্টার শ্রম সময়, মহার্ঘভাতা, পেনশন - আরো কতশত অধিকার অর্জিত হয়েছিল ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথে।
কিন্তু জীবনচক্র তো নিজস্ব গতিতেই তার আবর্তন সম্পূর্ণ করবে। তাই একসময় পুঁজিবাদও তার সর্বোচ্চ বিকাশের ক্রান্তিলগ্ন অতিক্রম করে পৌঁছে গেলো অবক্ষয়ের যুগে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে হিসেব করে না বললেও এটা বলা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের সময়কাল পর্যন্ত পুঁজিবাদ তার ঐতিহাসিক বিকাশের যুগে ছিল। এটা ছিল একই সাথে পুঁজির বিকাশের যুগ এবং শ্রমজীবীর দাবি আদায়ের যুগ। এরপর থেকে ক্রমে ক্রমে এই দাবি আদায়ের ক্ষেত্রটি সঙ্কুচিত হতে শুরু করে। বিগত প্রায় আট দশক ধরে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ প্রায় "নতুন" কোন অধিকার আদায় করতে পারে নি। আমি সংগত কারণেই এই 'নতুন' শব্দটিকে উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রাখলাম। কারণ বর্তমান সময়ে শ্রমজীবীদের সংগ্রাম কোন 'নতুন' অধিকার আদায়ের জন্য তো হচ্ছে না, বরং ইতিমধ্যে অর্জিত অধিকারগুলিকে সুরক্ষিত রাখতেই তাকে প্রাণপাত করতে হচ্ছে।
মে দিবসের কথাতেই আসা যাক। সেই ১৮৮৬ তে রক্তস্নাত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে আট ঘন্টার শ্রমসময়ের অধিকার অর্জিত হয়েছিল, বর্তমানে সেটাই টিঁকিয়ে রাখা দুষ্কর হয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই করোনার অজুহাতে ১২ ঘন্টা শ্রমসময়ের ঘোষণা করে দিয়েছে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি। শ্রমজীবীর বেতন-সংকোচন, মহার্ঘ স্থগিতাদেশ, নব-সংযোজন রহিতাদেশ ইত্যাদি সব চালু হয়ে গেছে, অর্থাৎ ইতিহাসের দীর্ঘ সংগ্রামে অর্জিত অধিকারগুলি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঐতিহাসিক কালপর্বে দাঁড়িয়ে আছে শ্রমজীবী মানুষ।
ঐতিহাসিক বাস্তবতার নির্যাস হাতেনাতেই পাচ্ছে সারা দুনিয়ার মেহনতী মানুষ। একেই বলে ইতিহাসের পাঠ্যসূচি। শ্রেণি সংগ্রামের স্বরূপ নির্ভর করে পুঁজিবাদের ঐতিহাসিক কালপর্বের উপর। যখন শ্রমিকের পক্ষে আর কোন নতুন গণতান্ত্রিক অধিকার অর্জন করা সম্ভব নয়, বরং পুরনো অর্জিত অধিকারগুলোকেই রক্ষা করা দুষ্কর হয়ে পড়ে,তখন শ্রেণিসংগ্রামের সিলেবাসে বিপ্লব অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সেই কবে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর শেষ বাক্যে লেখা হয়েছিল Workers of the world, unite!
আজকের পৃথিবী সেই আহ্বান অনুশীলন করার সত্যিকারের বাস্তবতায় পৌঁছে গেছে।
দুনিয়ার শ্রমজীবী এক হও!
![]() |
| জিন্না আহমেদ নির্দেশক, অভিনেতা (বোলপুর আমরা সবুজ) |





0 Comments