এই লেখার আগের অংশটুকু পড়বার জন্য, নিচের লেখাটির উপর ক্লিক করুন
শম্ভু মিত্র: নাট্যের ভাষা (পর্ব ১)
এই লেখার আগের অংশটুকু পড়বার জন্য উপরের লেখাটির উপর ক্লিক করুন
পর্ব ২
চার অধ্যায়ের নাট্যরূপ করেছিলেন বহুরূপী, শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায়। তার দ্বিতীয় দৃশ্য এলার ঘর। সেখানে অন্তু আর এলা বসে আছে। পেছনে গেরুয়া রঙের একটি আকাশী পট, ইন্দ্রনাথের কাছে এলা কথা দিয়েছিল, সে আজীবন কুমারী থাকবে। একটি নিচু সোফায় বসতেন তৃপ্তি মিত্র, শম্ভু মিত্রের অতীন বসতেন তার পায়ের কাছে। নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে বলতে উঠে পড়ে মোকামা ঘাটের স্মৃতি, অতীন আবৃত্তি করে— প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস/ তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ। সেই মুহূর্ত থেকে চরিত্রদের মুখের ওপর থেকে আলো মুছে যায়, সূর্যাস্তের আলোর রঙে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে পেছনে গেরুয়া কাপড়। এলার ঘর মুহূর্তের মধ্যে একটা অনন্তের বিস্তৃতি পায় আলোর সামান্য কারিকুরিতে। এই দৃশ্যের শেষে, হটাৎ চিঠি পেয়ে ঘর থেকে চলে যায় অতীন, এলা তখন ভেতরের ঘরে গেছে। ফাঁকা মঞ্চে প্রবেশ করে এলা, তার অন্তুকে ডাকতে থাকে, আলো ম্লান হয়ে যায়। শুধু মঞ্চের এককোনে রাখা বুক কেসের ওপরে রাখা একটি কালীর ছবি থাকত, জবাফুল দিয়ে ঢাকা, সব আলো নিভে গিয়ে সেই জবাফুলের আবডাল থেকে একটু আলো পড়ে দেবীর মুখে, নিচে থেকে পড়া আলোয় সে মুখ ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তখন মনে পড়ে, নাটকের সূচনায়, তৃতীয় ঘণ্টা বাজবার পরে ঘোর অন্ধকারে শোনা গিয়েছিল এক স্তোত্র, ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা, শুষ্ক মাংসে অতি ভয়ঙ্কর, রক্তনয়না হুংকারে চতুর্দিক প্রকম্পিত করা এক দেবীর বর্ণনা। এও মনে পড়ে, আমাদের হিংসাশ্রয়ী স্বদেশীদের পূজ্য ছিলেন দেবী কালী, চার অধ্যায় উপন্যাসে নেই, কিন্তু প্রযোজনায় সেই কালীর রূপকে নানাভাবে আভাসিত করে তোলা হয়েছে। আর একটি ছবির কথা বিশেষ করে মনে পড়ে। চার অধ্যায় নাটকের এ হল শেষ দৃশ্য। দৃশ্যটি ঘটছিল এলার বাড়ির ছাদে। বাড়িতে তখন কেউ নেই, রাত তখন প্রায় এগারোটা।
মঞ্চ প্রায় ফাঁকা থাকত, যেমন থাকে বাড়ির ছাদ। পেছনে মঞ্চে থাকত নিচু ছাদের পাঁচিল, তার ওপারে একটা ফ্লাটবাড়ির আলো। দুটি জানলা থেকে চৌকো দুটি আলো দেখা যাচ্ছে, আর মাঝখানে একটা লম্বাটে আলোর রেখা, সিঁড়ির আলো বলে বোঝা যায়। এলাকে খুন করতে এসেছে অন্তু, দলের নির্দেশে। নানা কথা হয় দুজনের মধ্যে, রাত বারোটার ঘণ্টা পড়ে, জানলাদুটির আলো নিভে যায়, শুধু মাঝবরাবর সিঁড়ির আলো জ্বলতেই থাকে। যেন এই দুটি পরস্পরের প্রতি উৎসুক নরনারী, যাদের ঘিরে আছে অনিবার্য মৃত্যু, তাদের ওপর পাহারাদারি করছে কোনো একচোখো দানব। সামনের মঞ্চে, দর্শকের ডানদিকে একটি শ্যাওলাধরা ফুলের টব, তাতে আছে ক্যাকটাস, মোটা পাতায় কঠিন, অনমনীয়, কাঁটাওয়ালা। কথা বলতে বলতে পুরনো দিনের কথা ওঠে, এলা অন্তুকে ছেড়ে বাইরে যায়, হাতে করে নিয়ে আসে মুঠো মুঠো সাদা ফুল। অন্তুর কাছে এসে সেই ফুল সে ছুঁড়ে দেয় শূন্যে। দুজনের গায়ে মাথায় এসে পড়ে সেই ফুল, গোল হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে থাকে, অবধারিতভাবে ফুলশয্যার অনুষঙ্গ মনে পড়ে যায়।
এমন উদাহরণ আরো দেওয়া সম্ভব। তার আগে অন্য দু একটি কথা বলে নিতে হবে। শিল্পীরা জানেন, নানা ধরনের রেখা মানুষের মনে নানা ধরনের মনোভাব তৈরি করে। সোজা সরল একটি রেখা, উল্লম্ব হয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে, দেখলেই মনে আসে ঋজুতার অনুষঙ্গ। ঠিক তেমনি নীচের দিকে ঝুঁকে পড়া কোনো রেখা তৈরি করে আনুগত্য বা বশ্যতার অনুষঙ্গ। রাজা অয়দিপাউস নাটকে মূল মঞ্চের একটু পেছন থেকে তৈরি করা হত নানা আকারের কয়েক ধাপ বেদী। সেই সব বেদীর একেবারে ওপরে, মূল মঞ্চ থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে থাকত সূর্য অঙ্কিত একটি তোরণ। দেশে মড়ক দেখা দিয়েছে, তাই প্রজারা এসেছে রাজার কাছে দেশকে দুদৈর্ব থেকে মুক্ত করার প্রার্থনা জানাতে। প্রার্থীরা থাকত নিচে, মূল মঞ্চে, তাদের মাথা থাকত নিচু, আর তাদের আহ্বান শুনে অয়দিপাউস বেরিয়ে আসতেন সেই উঁচু তোরণে, দু হাত দিয়ে তোরণের দুটি থামকে স্পর্শ করে। উল্লম্ব সরলরেখার বহু নিচে থাকত প্রার্থীরা, এইভাবে রাজার মহিমার সামনে নতজানু প্রার্থীদের বিন্যস্ত করা হত।
নাটকের শেষে, সেই উঁচু তোরণ দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে নেমে আসত অসহায় অয়দিপাউস, প্রথম দৃশ্যের ঋজুতা তখন অন্তর্হিত–এইভাবে শুধু দুটি দৃশ্যের বিন্যাসে গৌরবময় অধিকার থেকে পতনের ছবি তুলে ধরা হত। আর একটি অসাারন নাট্য মুহূর্তের কথা বলতে ইচ্ছে করছে। অয়দিপাউসকে হত্যা করার জন্য যার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল সেই মেষপালকে আনা হয়েছে মঞ্চে, সে বসে আছে মূল মঞ্চে, আর তার দু ধাপ ওপরের বেদী থেকে তাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে অয়দিপাউস। চরম সত্য আবিষ্কারের ঠিক আগে মেষপালক হাহাকার করে ওঠে, রাজা, আমি যে আজ এক সর্বনাশের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি। অয়দিপাউসরূপী শম্ভু মিত্র বলতেন, আমিও যে সেই সর্বনাশের কিনারায়, বলে লাফ মারতেন বেদী থেকে, টিপে ধরতেন মেষপালকের গলা।
শুধু অভিনয় নয়, এই অংশে প্রযোজনারাও একটি কারুকাজ ছিল। বেদীর ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজাকে ধরে থাকত আলো, আর নিচে মেষপালককে , মাঝখানের অংশটি থাকত অন্ধকার। ফলে, মেষপালকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বার সময় শম্ভু মিত্র একটা অন্ধকারের স্তর পার হয়ে আসতেন, দেখে মনে হত যেন অনেক উঁচু থেকে নিচে লাফিয়ে পড়লেন তিনি। মনে হয়, এ লাফ কি কেবলমাত্র মেষপালকের গলা টিপে ধরার জন্য? আমিও এক সর্বনাশের কিনারায় বলে যখন লাফ দেন অয়দিপাউস, তখন মনে না হয়ে পারে না, সেই কিনারা থেকে তিনি যেন লাফ দিয়ে পড়লেন সর্বনাশের মধ্যে।
অয়দিপাউসের সঙ্গে একই নাট্যোৎসবে প্রযোজিত হয়েছিল রাজা। একেবারেই অন্য রকম এই নাটক, রাজা অয়দিপাউসের তুলনায় তো বটেই, এর আগে করা বহুরূপীর রবীন্দ্র প্রযোজনাগুলির থেকেও এর জাত আলাদা। চার অধ্যায় বা বিসর্জনে একটা স্পষ্ট আখ্যান আছে, রক্তকরবীতেও তাই, সেই সব নাটকে দ্বন্দ্বের ধরন কম বেশি দর্শকের অভিজ্ঞতার কাছাকাছি। রাজা কিন্তু এদের তুলনায় একেবারেই আলাদা ধাঁচের নাটক, যার সম্পর্কে রাজার কথায় নামের প্রবন্ধে শম্ভু মিত্র বলেছেন, প্রায় নিরাভরণ একটি বহু স্তরায়িত দ্বন্দ্ব আছে। সুদর্শনা আর রাজার ঘর অন্ধকার। বসন্তোৎসবের রাজপথ আলোকময়, আবার মোহ ভেঙে সত্যিকারের বাইরে চলে আসা, আলোয় চলে আসার পরের যে আলো, তার ধরন বসন্তোৎসবের থেকে তো খানিকটা আলাদাই হতে হবে।
নির্দেশক জীবনের শেষ পর্বে শম্ভু মিত্র ফিরে এসেছিলেন আধুনিক সময়ের দিকে। অন্তত তাঁর চোখে সে সময় জুড়ে ছিল অন্ধকার, যে অন্ধকারের ছবি আমরা দেখতে পাব চাঁদ বণিকের পালার মধ্যে। তখন তিনি সুস্থ নন, চোখে ভাল দেখতে পান না। তা সত্যেও কী করে ভোলা যাবে বাকি ইতিহাস নাটকে সেন্টার টেবিলের তলা থেকে বেরিয়ে আসা আলোয় শরদিন্দুর ভয়ার্তমুখ, পেছনে আত্মহননের পক্ষে সীতানাথের সওয়াল, যে আসলে সেই শরদিন্দুরই মনের চেপে দেওয়া অংশ? কী করে ভোলা যাবে পাগলা ঘোড়া নাটকের কথা, যেখানে একটিমাত্র চৌকিতে বসে থাকা মদ্যপানরত চারটি চরিত্রের বিবিধ সংস্থাপন বা কম্পোজিশনে নানা অর্থময় মূর্তি তৈরি হয়ে উঠত?
এটা আসলে একটা অর্থহীন প্রবন্ধ। নাট্য কেমন করে মঞ্চের ওপর তার ভাষা তৈরি করে, উচ্চারণযোগ্য ভাষায় সে রহস্যের বিবরণ দেওয়ার সাধ্য এই লেখকের নেই। যাঁরা এই প্রযোজনাগুলি দেখেছেন, এ লেখা শুধু তাঁদের স্মৃতিকেই উস্কে দিতে পারে। সমাপ্ত
টেকনিক্যাল সহযোগিতা : রঞ্জিতা রায়
(নাট্যমেব জয়তে পত্রিকার ১০ মার্চ ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত)



0 Comments