মেকআপ আর্টিস্ট ফেলু রতন কর্মকারদের কথা গুলো

অশোক ঘোষ

(নির্দেশক, থিয়েটার্স ওয়ার্কাস)



একবস্তা বাঁশপাতা মাথার থেকে ধপাস কোরে ফেললো ফেলু রতন, ফেলু রতন কর্মকার, বাবা বাঁশরী রতন পনেরো বছর হোলো গত হয়েছে । রেখে গেছে, দুই কন্যা আর তাদের মাকে ! ফেলু তার বাবার পেশা গ্রহণ করেছিল !কিছুটা নাম ডাক হয়েছে, মেকআপ এর হাতটা ভালোই !থিয়েটার এর দলে কাজ করতে করতেই তার ডাক পরে ষ্টুডিও পাড়ায় !



আজ প্রায় দুমাস হতে চললো লকডাউন এ কাজ কম্মো শিকেয় উঠেছে তার ! দু বোনকে নিয়ে বাঁশবাগানের পাতা কিছু কাঠ কুড়িয়ে নিয়ে এলো । আজ দুদিন পরে একটু রান্না হবে ! ছোটো বোন আট কেলাসে পরে ! ওর স্কুল থেকে দু কিলো চাল, আধকিলো ডাল, এককিলো আলু দিয়েছে !


বড়বোন কোনো মতে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে শহর তলির শপিং মলে কাজ করতো । এখন সেটাও বন্ধ ! বাড়িতে বসে সবাই !আর চলছে না ফেলুদের সংসার !ফেলুর মা লোকের বাড়ী রান্নার কাজ করতো, এখন সে প্রশ্নই নেই !


ফেলু গামছা দিয়ে গায়ের ঘাম মোছে,  চিৎকার দিয়ে মাকে ডাকে, মা এসে উঠোনের উনুন ধরিয়ে রান্নার জোগাড় করে ! ছোটো বোনের কাছে জল চায়, ছোটো বোন জল দেয় !

... কিরে মধু ক্ষিদে পাচ্ছে !
নাতো..., ছোটো উত্তর দিয়ে ঘরে ঢুকে যায় ! বড় বোন কুটু গতকাল একটা পাঁউরুটি এনেছিল, চারজনে সেটা খেয়েই রাত কাটিয়েছে !
একটু ঝুজকো ভোরে উঠে তিন ভাইবোন মিলে কাঠকুটো জোগাড় করে এনেছে, মা আরতি দেবী ভাত বসিয়েছে... ! দাওয়ায় বহুদিনের পুরনো দড়ির দোলনায় বসে ফেলু রতন দোল খেতে খেতে ফেলে আসা নিকট অতীতে ফিরে যায়..... ! 
'মা বেরোচ্ছি... '
'আজ এতো সকালে কেনো..? '
আরে মনি দাদের আজ ম্যাটিনি শো একাডেমী তে, এই সকালে জানলাম....? '


অশোক ঘোষ (নির্দেশক, থিয়েটার ওয়ার্কাস)

... বড় বোন কুটু বলে 'আজ শো আজ বলছে 
? ''না না ওরা বলেছিলো, কিন্তু আমি জানতাম ইভিনিং.. সেটাই একটু আগে জানলাম, তা তুই আজ ডিউটি যাবিনা ? 
'... 'যাবো আজ আমার বেলায় ডিউটি, দাদা জাতীয় নাট্য মেলার দুটো টিকিট এনে দিওতো  !'
'কে যাবে,? '....
 'ওই আমাদের সেলস ম্যানেজার ম্যাডাম.. আর একজন বোধ হয় ওনার হাসব্যান্ড !'
'ঠিক আছে, কাউন্টার খোলেনি, খুললে এনে দোবো..., চলি !'

ভাবতে ভাবতে দোল খেতেই ভুলে গেসলো ফেলু, আবার পায়ের টিপ দিয়ে দোল খাওয়া শুরু করলো... !
১১:০৫ এর উলুবেড়ে লোকাল টা ধরবে... রেললাইনের পাস দিয়ে শর্ট কার্ট ধরে হেঁটে চলেছে ফেলু.... স্টেশন এর কাছে এসে  রেলের ঘোষণা শুনতে পেলো... উলুবেড়িয়া লোকাল আসতে দেরী হবে... !ফেলুর মাথায় বাজ পড়লো, যে ভাবেই হোক তাকে বেলা 1টায়  হলে ঢুকতেই হবে, অবশেষে বাস ধরতে জাতীয় সড়কের মোড়ে এসে দাঁড়ালো... !এক্সসাইড থেকে পড়িমরি করে দৌড়তে লাগলো ফেলু ঘড়িতে 1.35, অনেকগুলো কারেকশন মেকআপ আছে, সঙ্গের বিমল টা নিশ্চয় ছোটো খাটো মেকআপ গুলো ধরে নিয়েছে.. 
এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই একাডেমী র গেটে পৌঁছে গেলো..... গ্রীন রুমের দরজা ঠেলে ঢুকলো.... সবাই চুপচাপ, বিমল সান্তা দির মেকআপ করাচ্ছে... !টেবিল এ মেকআপ সরঞ্জাম খুলে মেকআপ শুরু করতে যাবে.. ভেতর থেকে ডিরেক্টর মনি দা এলো.... রাশভারী গলায় বললো... 'তোমার বাবার সিনসিরিযারিটির কোনো তুলনা হয় না, কবে শিখবে বাল.... আড়াইটা বাজতে চললো... !'ফেলু কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বলে চললো.....', তুমি টালিগঞ্জ এ গিয়েই...., 'কথা শেষ হবার আগেই ফেলু বলে গন্ডগোলের জন্যে ট্রেন বন্ধ, তাই বাস এ এসেছে !সে সব শোনবার ধৈর্য্য না দেখিয়েই মনি তাকে কোলকাতায় থাকার কথা বললো !
তারপর থেকেই ফেলু ঠিক করেছিল কলকাতায় থাকবে !
এইসব নানা ভাবনায় ডুব দিয়েছিলো সে !'দাদা খাবে এসো... 'ছোটো বোনের ডাকে সম্বিত ফেরে ফেলুর..... দোলনা থেকে নেমে খেতে গেল সে..... !


দুপুরে ভাতঘুম দিতে গিয়ে ঘুম তো এলোই না, আকাশ পাতাল ভাবনা মাথায় ভিড় করছে !বড় বোনটার বিয়ে দিতে হবে..!দুমাসের 
Lockdown এ যে টুকু পয়সা হাতে ছিল সব শেষ... কোনো দোকান আর ধার দেবে না !কী করে কী হবে.. মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে ফেলুর !
এ ভাবেই দিন কাটে ফেলুর... !এইমাত্র খবর পেলো  ফেলু যে তাদের গ্রীন জোন, তাই কিছু ছাড় দিয়েছে... !চোখ দুটো চক চক করে ওঠে.... কিন্তু শহরে যেতে পারবে না !অনেক ভেবে ঠিক করলো কাঁচা আনাজের ব্যবসা করবে !
ভোর উঠে সাইকেলে সবজি কিনে পাড়ায় বসেছে.. বিক্রি বাটা ভালোই হচ্ছে !
রাতে শোবার আগে নিজের হাত দুটো দেখে !যে হাতে বহু নামি দামী শিল্পীদের সে রূপদান করতো, আজ তাকে সেই হাতে দাঁড়িপাল্লা ধরতে হচ্ছে....এ যন্ত্রনা তাকে শেষ করে দিচ্ছে !তবু বাঁচতে হবেই... !বহুদিন বর্ষার অপেক্ষায় থাকা আদিম চাষা যেমন প্রথম বর্ষণের তীব্র ধারায় স্নাত হয়ে আতুর  হয়ে ওঠে মাঠ ভরা সোনালী ফসলের স্বপ্নে.... ফেলুও সেই স্বপ্নে বিভোর থাকে... আশায় থাকে কোনো একদিন সব ঠিক হবে !


ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছাড়িয়ে গেছে.. কী একটা আওয়াজে চমকে ওঠে ফেলু... জানলা দিয়ে মুখ বাড়ায় সে.... !
বড়বোন কুটু টর্চ জ্বেলে কোথায় চলেছে !তাকে অনুসরণ করে ফেলু যা দেখলো তা কল্পনারও অতীত.... !নিজের প্রতি ঘেন্না লাগছে তার !কুটুর দেওয়া টাকা দিয়েই তার আনাজ ব্যবসা.... কিন্তু এ কী.... শেষ পর্যন্ত অভাব তার বোন কে.... !বমি পাচ্ছে ফেলুর.... দ্রুত ফিরে এসে বমি করে.... পিছন দিয়ে কুটু নিজেকে আড়াল করে ঘরে ঢোকে !.... kকোথায় গেছিলি কুটু?....কথা বলে না কুটু........ 'আমার জন্যে এই অবস্থা... ছিঃ ছিঃ... তা বলে তুই ওই নোংরা লোকটার কাছে... ছিঃ.. ', ঘরে ঢুকে যায়..... !





সকালে কান্নার আওয়াজে ঘুম ভাঙে ফেলুর ! টুকু বিষ খেয়েছে.... দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পরে বোনের বুকের ওপর !
ধড়াস করে ঘুম ভেঙে যায়.... ফেলু চরণের !
সূর্যের প্রথম আলোয় ঝলমল করে উঠেছে চতুর্দিক ! সাইকেল চালিয়ে পাইকের বাজারের দিকে রওনা দেয় ফেলু.... দুর থেকে টুকু হাত নাড়িয়ে টিউশন করতে পা ফেলে..... !!



Post a Comment

0 Comments