অশোক ঘোষ
(নির্দেশক, থিয়েটার্স ওয়ার্কাস)
হ্যালো, কে বলছেন !!!
... 'সেকি চিনতে পারছোনা গিরিশ? '
না, চেনা চেনা গলাটা.. কিন্তু ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না তুমি কে?
... 'ভালো করে মনে করার চেষ্টা করো আমাকে.. বিশ্বের এই দুঃসময়ে আমায় ভুলতে বসেছো দেখছি.... '
দ্যাখো, হেঁয়ালি রেখে স্পষ্ট করে বলো তুমি কে... আর এই দুর্দিনে ফোন করেছো কেন !আমি সাফ বলে দিচ্ছি কোনোরকম সাহায্য সহযোগিতা করতে আমি পারবোনা !'
আচ্ছা গিরিশ, তুমি এতো বিরক্ত হচ্ছো কেন !
এই সময়ে নিজেদের মধ্যে একটা লিয়াজোঁ মেইনটেইন করলে তো খারাপ হয় না... !
.... .'তার আগে তোমার পরিচয় টা তো দেবে নাকি !!'
ধরে নাও তোমারি গোত্রের কেউ... তোমার মতোই কষ্ট করে একটার পর একটা দিন অতিবাহিত করছি !অন্ধকারে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছি..
.....'আমারো এক অবস্থা, খাড়া দাঁড়িয়ে, বাইরে ভিতরে দুদিকেই লকডাউন !কবে যে.... খুলবে সব কে জানে !আমার তো স্বাভাবিক অবস্থা যখন ছিল তখনো যে খুব ভালো ছিল তাতো নয়,
লোকজন খুব কমই আসতো !রবিবার একটু লোকজন হতো.. সেটা থেকেই একটু অক্সিজেন নিতাম !আর রোজ অন্তত আলো টা জ্বলতো... এখনের মতো দুরবস্থা হতো না !এখন তো আলো জ্বালানোর কেউ নেই !চুপচাপ !'
আমার সামনে দিয়ে পুলিশ ভ্যান ট্যান দু একটা যায়, এই যা, আগে আমার এখানটা কতো ঝলমল করতো... লোকজন, কপোত কপোতি আমার পায়ের নিচে, সামনের বাগানটায় তারা নিশ্চিন্তে প্রেমালাপ করতো... ভেতরে আলো জ্বলুক না জ্বলুক বাইরের কোলাহল এ আমার মন ভোরে থাকতো... এখন সেসব অতীত !
.....'সেই, কবে যে সব ঠিক হবে !তবু তো তোমার সামনে বাগান.... আমার সামনে যত দোকান বাজার, সব সময় একটা শৃঙ্খলাহীন চিৎকার... তারপর বিভিন্ন সময়ে প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রা, নানান বাজনা, কান ঝালাপালা হয়ে যেত... বাচ্ছাগুলো ভেতরে নাটক করতো.. দর্শকদের অসুবিধা খুব... !এখন এই lockdown এ সকালে একটু বাজার বসে ব্যাস... তারপর সুনসান !মাঝে মধ্যে শববাহী গাড়িতে হরিধ্বনি দিতে দিতে যায়... তখনো যেত খুব একটা
গায়ে লাগতো না, এখন যেন বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে... '
তবু ভালো... আমার তো সে সুযোগ নেই... তাই এই একঘেয়েমি কাটাতে তোমাদের ফোন করা, আমি রবীন্দ্র সদন বলছি গিরিশ.. !
'ও তাই বলো !ভালো থেকো, অপেক্ষা করছি... কবে সব খুলবে !'
ঠিক আছে চলো... ভালো থেকো... !
হ্যালো....
... 'কে? '
আমি
... 'আমি টা কে, সরকার বাহাদুর... কোনো খবর আছে !!'
আমি রবীন্দ্র সদন বলছি
.... 'ও রবীন্দ্র সদন, তা কী খবর? কী হবে গো? '
কী আর হবে, আমরা তো আর মরবো না,তবে মানুষের এই দুরবস্থা চোখে দেখা যাচ্ছে না !
আমার এখানে যে সব প্রোগ্রাম হতো তা এই কোরোনারঅনেক আগে
থেকেই সব বন্ধ... টুকটাক নাচ গান, জলসা তাও মাসের অর্ধেক দিন আমার মুখে তালা ঝুলতো !
আর এখন তো পুরোই লক ডাউন !
মধুসুদন তোমার কথা বলো
.... 'কী আর বলি, সব শুনসান হয়ে আছে !শো হোক বা না হোক, সব সময় আমার পায়ের কাছে কতো মানুষ এসে বসতো...পাশের মার্কেট এ কেনা কাটা করতো... !শো থাকলে তো কথাই নেই একেবারে জমজমাট... !'
কিছুদিন আগেও তো হল সারানোর জন্য সরকার বন্ধ রেখেছিলো, একটানা বন্ধ থাকার জ্বালাটা তুমি বুঝতে.. !
....... 'দেখো, ঠিক যে হল সারানোর জন্য বেশ কয়েকমাস শো বন্ধ ছিল... কষ্ট হতো কিন্তু লোকজন ভেতরে কাজ করতো, মিস্তিরি রা আসতো... !বিকেলে বাইরে লোকজন আসতো, খুব খারাপ লাগতো না !দল গুলোর জন্যে একটু কষ্ট হতো.. !মাঝে মধ্যে থিয়েটার এর লোকজনেরা এসে কবে খুলবে সে খোঁজ নিতো !কিন্তু এখন তো লকডাউনের বাজারে লোক সব ভ্যানিস হয়ে গেছে... নিঝুম নিস্তব্ধ, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে !'
সেই, আমারো একই অবস্থা... তাই সবার খোঁজ খবর নিচ্ছি !গিরিশ মঞ্চের সঙ্গে অনেক কথা হোলো !
.... 'তাই.... কিরকম আছে ও !অবশ্য ও আর আলাদা কী থাকবে, ওর মুখেও তো তালা ঝুলছে... !'
ঠিক, সবাই আমরা একই যন্ত্রনায় মরছি... শিশিরের তো কোনো হেলদোল নেই, আমার আর নন্দনের ছায়ায় ও চোখ বুজে বিশ্রাম করছে !আমাদের হলের লোকগুলো তো তবু ভালো... সরকারের কাছ থেকে বেতন টা পাবে, চুক্তির কর্মীরা অবশ্য সেটা পাবে না, এই সরকার নতুন লোকজন তো নেয়নি.... অবসর এর পর প্রচুর পদ শূন্য পরে আছে !!ঠিক আছে... বিশ্রাম করো,
...... 'আর এখন সকাল দুপুর রাত্রি এক ভাবে তালা বন্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে.... নতুন করে আর কী বিশ্রাম নোবো বলো !ভালো থেকো তুমিও !'
অশোক ঘোষ (নির্দেশক, থিয়েটার্স ওয়ার্কাস)
মন টা বড়ো অস্থির হয়ে আছে তাই তোমাদের ফোন করছি.. !আমাদের হলের সরকারী লোক গুলো চালিয়ে নেবে... আমি ভাবছি বেসরকারি হল গুলোর কথা.. !দেখি তপন কে একবার ফোন করি..
হ্যালো... তপন?
..... 'হ্যাঁ, কে... এখন হল বন্ধ.. '
তাইতো খোঁজ নিচ্ছি !
.... 'কে?
আমি সদন বলছি !রবীন্দ্র সদন...
...... 'কী সৌভাগ্য, সরকারী হল আমার মতো একটা বেসরকারি দুর্বল মানুষের অধীনে থাকা হলের খোঁজ নিচ্ছ !আর পারছি না গো সদন.. বন্ধ হয়ে পরে আছি, কবে যে খুলবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই !'
সেই, আমারো এক অবস্থা.. এখানে এলে তোমার গা ছমছম করবে !জনমানব শূন্য এই গোটা চত্বর !খুব খুব মন খারাপ তোমার হলের কর্মী গুলোর কথা ভেবে !
......'আর বোলোনা, এখানের কর্মচারীদের যা মাইনে তাতে সংসার চলে না, মুখ ফুটে না বললেও আমি তো জানি... প্রতিমাসেই এদের ধার করতে হয় !ভাবি এতো অল্প পয়সায় কী করে চলে এদের... যাবেই বা কোথায়... থিয়েটার না করলেও থিয়েটার টা যাতে বাঁচে সে লড়াই টা এরা দিয়েছে ভাই... কয়েক মাস আগে মালিক অসুস্থ হয়ে হসপিটালে ভর্তি !একটা পয়সা নেই... কর্মচারীরা ঠিক করলো নিজেরাই হল চালাবে, তাই হোলো, মাইনের তোয়াক্কা না করে যত রকমের কৃচ্ছসাধন করা যায় তাই করলো... নাটক বা হল বন্ধ হতে দিল না !''
তাইতো ভাবছি ওদের দম আছে... থিয়েটার কে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসে ওরা, কিন্তু এতদিন হল বন্ধ থাকলে ওদের কী করে চলবে... !
.... "কী একটা ফান্ড হয়েছে, কিন্তু যেহেতু এরা মাইনে পায় তাই এদের দেওয়া যাবে না !মুখ বন্ধ করে চোখ বুজিয়ে ওদের কথাই ভাবছিলাম, তুমি ফোন করলে.... ভালোই হোলো তবু একটু কথা বললে, আমার খোঁজ নিলে... আর দেখোনা, আমার গোটা শরীরের বিভিন্ন জায়গায় পায়রা বাসা বেঁধেছে, চতুর্দিকে পায়খানা, গন্ধে ভুত পালাচ্ছে... !ভালো থেকো সদন !"
তুমিও ভালো থেকো... !
হ্যালো.... একাডেমী? আমি তোমার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী বলছি !
..... "আমার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী আবার কে? হেঁয়ালি রেখে বলতো তুমি কে... এই lockdown এর বাজারে ফোন করে কেন বিরক্ত করছো.... দুমাস ধরে বন্ধ হয়ে বদ্ধ হয়ে আছি.!কে তুমি বলো, না হলে ফোন রাখছি... ""
না না, কেটো না... আমি সদন বলছি !
... "তোমার গলাটা এমন লাগছে কেন রবীন্দ্র সদন !তোমরা বেশ আছো... সরকার আছে তোমাদের !"
তা আছে... তবে আট ন বছর নানান ভাবে আমরা বঞ্চিত, সে বাদ দাও... তোমার খবর বলো, !
... "আমার আর কী খবর, মরা আগলে বসে থাকা, আর কী !মার্চ পর্যন্ত সবার বেতন পেয়েছে... কিন্তু এপ্রিল মে বেতন দিতে পারবে না.... যদিও অফিসিয়ালি জানায় নি !আমি কানা ঘুঁষো শুনলাম !আদৌ হল খুলবে বলে তো মনে হয়না.... কতদিন এভাবে মুখ বুজে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কে জানে !"
থিয়েটার কর্মী বা তার টেকনিশান... কী করবে বলতো... এমনি তো তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় !আর ক্রমাগত এই অবস্থা কতো সংসার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, অভাবের তাড়নায় শেষ হয়ে যাবে...
..... "রবীন্দ্র সদন তোমার তো মহামান্য সরকার বাহাদুরের সঙ্গে খুবই যোগাযোগ... দেখোনা এই আপতকালীন সময়ে কিছু সরকারী অনুদান দিয়ে হল কর্মী আর কলাকুশলীদের বাড়ির লোকের মুখে একটু অন্য তুলে দেওয়া যায় কিনা.... দেখোনা সদন.... দেখো না প্লিজ !"
তুমি কাঁদছো একাডেমী.. !
.... "হ্যাঁ গো, জন্মাবার পর থেকে এই অবস্থা তো দেখিনি, লোক গুলো যে খুব কাছের, ওদের গায়ের গন্ধ, গলার আওয়াজ আমার বড্ড চেনা.. থিয়েটার হচ্ছে না, বন্ধ ওদের ভেতরে রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে..., জানিনা কী ভাবে চলছে ওদের... !ওই দুশ্চিন্তা নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছি.. নতুন ভোরের মুখ দেখার আশায় !"
আমারো যে বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে একাডেমী... জানিনা কী হবে.., তবে এটা ঠিক থিয়েটার নতুন করে ভাববে, নতুন পথ সে বের করবেই... এই আশা আমার আছে.. চোখের জলে দৃষ্টি ঝাপসা কোরো না, এখনো অনেক লড়াই বাকী, যন্ত্রনা বুকে নিয়েই লড়তে হবে, ভালো থেকো একাডেমী, ভালো থেকো... তোমার চোখের জল ব্যর্থ হবে না.. ভালো থেকো !


0 Comments