কেষ্টদার বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেখলাম...



অশোক ঘোষ

অনেকদিন আগে একটা নিমন্ত্রণ ছিল এক প্রতিবেশীর ছেলের অন্নপ্রাশনের !যথারীতি খেতে বসেছি !তখন এখনের মতো চেয়ার টেবিল ছিলোনা !বেতের আসনে বসা আর কলাপাতা, মাটির গেলাস !আমার পাশে বসেছে আমাদের পাড়ার কেষ্ট দার নাতি !আমরা বসেছিলাম ওই বড় বাড়ির মূল গেটের কাছের দালানে !দালান থেকে নেমে গেট দিয়ে বাইরে বেরোলেই পুকুর, আমি বসেছিলাম খাওয়া শেষে চট করে উঠে বাইরে ভিড় হবার আগে হাত দোবো বলে !পুকুরে হাত ধোয়ার জন্য হুড়োহুড়ি যাতে না করতে হয় !পাতে একজন এসে নুন দিয়ে গেল !আমি পাশে এবং শেষ আসনে বসা কেষ্ট দার নাতিকে বললাম আমার জায়গায় বসতে, আমি ওর জায়গাটায় বসবো !ও রাজী না, অগত্যা !তারপর পরিবেশন শুরু, প্রথমে লম্বা বোঁটা সমেত এক ফালি বেগুন ভাজা, পর পর সব পদ আসতে লাগলো, ভাত ঘি মাছের মাথা দিয়ে ডাল.... চিঙড়ি পটল, তোপসে ফ্রাই, কাতলা কালিয়া ইত্যাদি, হঠাৎ খেয়াল হোলো পাশে বসা বাচ্ছাটা নিচ্ছে সব, খাচ্ছে অল্প !জমিয়ে রাখছে !জিজ্ঞাসা করলাম খাচ্ছে না কেন !আমার কথায় কান দিলোনা !এক গাল ভাত খাচ্ছে আর ঢক ঢক করে জল খাচ্ছে !কিছু পরে ওর জলের গেলাস টা উল্টে গেল, সেটা উপুড় করে রেখে আর একটা গেলাস চাইলো, পেলো আর একটা গেলাস !দই, মিষ্টি, চাটনি, পাঁপড় এর পর পান নিচ্ছি হঠাৎ দেখলাম পাশে বসা বাচ্ছা টা নেই, নেই শুধু নয় নিজের পাতা সমেত উধাও !সাধারণ ভাবে প্রথম থেকেই আমার একটু অন্যরকম মনে হচ্ছিলো কেষ্ট দার নাতিকে, পরনে সেই আধ ময়লা ইজের, রঙ চটা বুশ শার্ট !যদিও ওটার সাথে পাত কুড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই, তবুও কিরকম একটা মনে হচ্ছিলো !তাড়াতাড়ি পুকুর থেকে হাত ধুয়ে কেষ্ট দার বাড়ির দিকে গেলাম !দেখলাম ওই ছেলেটা কলাপাতা আর গেলাসে কিছু ভাত মিষ্টি মাছ সব বুকে করেজাপ্টে নিয়ে দৌড়োচ্ছে, আমি ওর পিছনে, আমায় দেখে লজ্জা পেলো !লক্ষ্য করলাম ও দাঁড়িয়ে পড়েছে পা দুটো ফাঁক করে, আমি কাছে গেলাম..... ওর গিট্ বাঁধা ইজের টা খুলে নিচের দিকে নামছে... কোনটা বাঁচাবে খাবার নাকি নিজের লজ্জা !সমস্যা টা বুঝে কাছে গিয়ে সাহায্য করতে চাইলাম....... ওর চোখ দিয়ে টস টস করে জল পড়ছে, আমি ইজের টা তুলে গিট্ বেঁধে দিলাম জোরে, যাতে আর খুলে না যায় !ও দৌড়োতে লাগলো ওর দাদা ও মা কে চিৎকার করে..... পুকুরের পার দিয়ে চলে গেল কেষ্ট দার নাতি !অদৃশ্য হোলো বটে কিন্তু কথা গুলো কানে এল, মা... দাদা ভাত এনেছি, মাছ.. রসগোল্লা তোমরাও খাবে, দাদুও খাবে... !আমি তখন কথা গুলো শুনতে শুনতে নিজের অজান্তে কেষ্টদার বাড়ির দরজায় পৌঁছে দেখলাম........ শেষ রক্ষে হলো না,  ছেলেটা অভুক্ত মা দাদা আর দাদুর মুখে ভাত তুলে দেবার আনন্দে দৌড়ে বাড়ি ঢুকতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে দোরগোড়ায় পড়লো, সব খাবার বাড়ির উঠোনে ছড়িয়ে..... আমি বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখলাম ----ছেলেটা স্থির, মা তাকে বুকে টেনে সে কী কান্না.... আমি চোখের জল আটকে রাখতে পারলাম না !অবসন্ন মনে হাঁটতে থাকলাম নিজের গন্ত্যবে !!!



Post a Comment

1 Comments

মন কেমনে র গল্প