(প্রসন্নরজীর দেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তর্জমা)
লেখক : ফণিভূষণ মণ্ডল
।। এক ।।
¤ অভিনেতার আনন্দ ও মুক্তি ¤
--------------------------------------
• অভিনেতা ও অভিনয়
তুমি অভিনেতা হতে চাও - যে কারণে থিয়েটারের নানা রকম কৌশল রপ্ত করতে এবং থিয়েটারের খুঁটিনাটি শিক্ষা গ্রহণ করতে তুমি নানা থিয়েটারি প্রতিষ্ঠানে গেছো, তা শেখার জন্য প্রচুর পরিশ্রমও করেছ - এটা একজন অভিনেতা হয়ে ওঠার ভালো দিক বটে কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়।
অভিনয় কি ? আমার মনে হয় অভিনয় প্রক্রিয়াটির সঙ্গে 'গেম' বা খেলা বিশেষভাবে জড়িত। কেননা অভিনয় থিয়েটারের সঙ্গে আষ্ঠে-পৃষ্ঠে জড়িত, শুধু তাই নয় থিয়েটারকে ইংরেজিতে 'প্লে'-ও বলা হয়। অর্থাৎ অভিনয়ের মাধ্যমে তুমি থিয়েটারে এক ধরনের খেলা বা 'প্লে' প্রদর্শন করছ দর্শকদের সামনে। তাই দেখতে হবে যে, তুমি এক বছর বা তিন বছরের ডিপ্লোমা কোর্সে কিংবা পাঁচ বছর থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে যখন অভিনয় প্রদর্শন করছ তখন আনন্দ উপভোগ করছ কিনা ? কিংবা সেই মানসিকতা তোমার মধ্যে গড়ে উঠেছে কিনা ?
• অভিনয় ও আনন্দ
অধিকাংশ অভিনেতা অভিনয়ের ব্যাপারে খুবই 'সিরিয়াস', যে কারণে তারা বাস্তবতাকে যথাযথভাবে থিয়েটারে ফুটিয়ে তুলতে চায়। এটা একজন অভিনেতা করতেই পারে, তা নিয়ে আমার কোনো আপত্তিও নেই কিংবা কোনো নেতিবাচক ভাবনাও পোষণ করি না। যেহেতু থিয়েটার একটা সিরিয়াস ব্যাপার, তাই অভিনেতা যদি সিরিয়াস হন কিংবা প্রফেশনাল হন - তাতে তো কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু যদি এটা ধরে নিই যে থিয়েটার একটা 'গেম' বা খেলা তাহলে দেখতে হবে যে একজন অভিনেতা অভিনয় করার মাধ্যমে আনন্দ/তৃপ্তি পাচ্ছেন কিনা ? যদি তিনি অভিনয় করে আনন্দ না পান তাহলে অভিনেতা হিসেবে তিনি ব্যর্থ।
একজন অভিনেতা হিসেবে আনন্দ পাওয়ার অনেকগুলি স্তর আছে। যেমন - তিনি মহলা দেওয়ার সময় আনন্দ পাচ্ছেন কিনা, কিংবা কোনো একজন কূট বা বদমাশ বা হত্যাকারী চরিত্রে অভিনয় করে তৃপ্তি পাচ্ছেন কিনা ? অর্থাৎ তুমি কোনো ভালো বা মন্দ চরিত্রে, দুঃখী বা সুখীর চরিত্রে, কোনো হাস্যকর বা সিরিয়াস চরিত্রে অভিনয় করে ভেতর থেকে আনন্দ উপলব্ধি করছ কিনা সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা যদি তুমি সহ-অভিনেতা/অভিনেত্রীর সঙ্গে অভিনয় করে ভেতর থেকে আনন্দ উপলব্ধি না কর তাহলে তুমি খারাপ অভিনেতা। তাই শুধু অভিনয় করলেই হবে না, সেই সঙ্গে অভিনেতার আনন্দ উপলব্ধির ব্যাপারটাও অঙ্গাঙ্গি জড়িত।
• আনন্দ ও মহড়া
অভিনেতা যদি ভাবে যে সে রিহার্সাল না দিয়ে সরাসরি মঞ্চে অভিনয় করে দেবো - এই ভাবনায় বিশ্বাসী অভিনেতাকে আমি খারাপ অভিনেতাই বলবো। কেননা যদি তুমি রিহার্সালে আনন্দ না পাও কিংবা রিহার্সাল না দিয়ে ভাবো যে আমার এত রিহার্সালের প্রয়োজন নেই - অভিনেতার এই মানসিকতা আমার কাছে বেশ নীচু মানের। ফলস্বরূপ আর একটা বিষয়ের সম্ভাবনা থেকে যায়, রিহার্সাল না দেওয়া বা কম দেওয়ার কারণে তুমি ফাইনাল মহড়াতে অভিনয় করতে হবে বলে অভিনয় করো, ফলে তুমি নিজের পারফরম্যান্সে আনন্দ পাও না - যা একজন খারাপ অভিনেতার লক্ষণ বলে আমার মনে হয়। তাই আমার মনে হয় অভিনয়ের মাধ্যমে অভিনেতার আনন্দ লাভ করার সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম স্তর রয়েছে।
যেমন প্রথম দিনের রিহার্সালের কথা ধরা যেতে পারে, যেখানে তোমার অভিজ্ঞতা মোটেও তৃপ্তিদায়ক হয় না - তা আমি জোরের সাথেই বলতে পারি। কেননা সেদিন তুমি তোমার পরিচিত গন্ডির বাইরে অজানা জায়গায় দাঁড়িয়ে অভিনয়ের মহড়া দিচ্ছ, ফলে তোমার আনকমফর্টেবল লাগাটাই স্বাভাবিক। যেহেতু চেনা চৌহদ্দির মধ্যেই তো মানুষ আনন্দ পায়।
প্রথম দিনের রিহার্সালে তোমার এক হাতে স্ক্রিপ্ট আর অন্যদিকে নির্দেশকের অমুক দিকে তাকাও, এইভাবে সংলাপ বল ইত্যাদির জেরে তোমার অবস্থা বেজায় কঠিন। কিন্তু ওই অবস্থায় ধৈর্য্য ধরে মনকে শান্ত রেখে তুমি যেমনটা বুঝতে পেরেছ ঠিক ততটুকুই করার চেষ্টা কর, অন্যে কতটা ভালো বা খারাপ করেছে তা নিয়ে মাথা ঘামিও না। আসলে প্রথম দিনের রিহার্সালে একজন অভিনেতা কতটুকুই বা করতে পারে ! একদিকে যেমন নাটকের দৃশ্যগুলির মধ্যে একটা যান্ত্রিক-সমন্বয়-সংযোগ ('মেকানিক্যাল কনস্ট্রাকশন') গড়ে ওঠে অন্যদিকে তেমনই তোমার সংলাপের মধ্য দিয়ে সহ-অভিনেতার সঙ্গেও একই রকমভাবে যান্ত্রিক-সমন্বয়-সংযোগের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
প্রথম দিনের পর দ্বিতীয়-তৃতীয় দিনের মাথায় তোমার ভেতরে যান্ত্রিক সমন্বয়ের কৃত্রিমতা বা জড়তা কেটে যেতে থাকবে। আর এটা হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক, তখন তুমিও অনেক বেশি কমফর্টেল হয়ে উঠবে। যার ফলে তুমি চরিত্রের মধ্যে প্রবেশ করতে পারবে এবং ওই চরিত্রে অভিনয় করার মধ্য দিয়ে তুমি আনন্দ অনুভব করতে শুরু করবে। তাই প্রথম দিনের রিহার্সালের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে বারবার অনুশীলনের দিকে মন দেওয়া জরুরী।

আত্মকথনে চপল ভাদুড়ী, পর্ব - ৩
পড়বার জন্য উপরের লেখাটির উপর ক্লিক করুন• মহড়া ও রসায়ন
সাধারণত প্রথম দিনের রিহার্সালে তোমার সহ-অভিনেতা বা অভিনেত্রী পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সারাক্ষণ চেষ্টা করবে যাতে তুমি টেন্সটড্ থাকো। আসলে তোমাকে ভাবতে হবে যে তুমি যেটা করছ সেটা কতটা হচ্ছে তা তুমি নিজেই বুঝতে পারছ না, একইভাবে তোমার সহ-অভিনেতা বা অভিনেত্রীও যেটা করছে তা সে কতটুকু বুঝে করছে - তখন তোমার ওই টেনশনটা আর থাকবে না। আর তারপর থেকেই তুমি অভিনয়ের ভেতরে ঢুকতে পারবে না হলে মনে হবে যে তুমি চরিত্রটার ভেতরে ঢুকতেই পারছ না। এটাই তো থিয়েটারের মজা !
অন্যদিকে তোমার সঙ্গে সহ-অভিনেতা বা অভিনেত্রীর থিয়েটারি সম্পর্কটা ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে যখন দু'জনেই চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত চরিত্রের ভেতরে ঢুকতে না পারছ ততক্ষণ পর্যন্ত আড়ষ্টতা বা জড়তা কাটবে না, ফলস্বরূপ অধিকাংশ অভিনেতা অন্য অভিনেতা বা অভিনেত্রীর দিকে তাকিয়ে সারাক্ষণ সংলাপ বলে না হয়ে শূন্যে তাকিয়ে সংলাপ আওড়ে যায় - যা কিন্তু থিয়েটারে বড্ড বেমানান। ফলে চরিত্রের সঙ্গে বোঝাপড়া না হলে কিন্তু অভিনেতাদের মধ্যে অভিনয়ের রসায়নটা গড়ে উঠবে না।
এটা মনে রাখা দরকার যে থিয়েটার কিন্তু ভগবান প্রদত্ত জিনিস নয় কিংবা অ্যাবস্ট্রাক্ট কোনো বায়বীয় ভূত নয়, তাই অভিনেতার অসাধারণ মেধা বা ভগবান প্রদত্ত অভিনয় দক্ষতাই শেষ কথা নয়, এসবের পাশাপাশি অভিনেতার স্থির চিন্তা, থিয়েটারি অধ্যাবসায় ও পরিচর্যা একান্ত কাম্য। থিয়েটার অনেক বেশি মাটির কাছাকাছি এবং মানুষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিকভাবে জড়িত।
।। দুই ।।
¤ সমালোচকের দায়িত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি ¤
--------------------------------------------------------
একজন থিয়েটার সমালোচকের উচিত কোন্ থিয়েটার বা নাটক সমাজের পক্ষে মঙ্গল জনক বা হিতকর আর কোন্ থিয়েটার ক্ষতিকর তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা। এই কাজটি একজন সমালোচক তখন করতে পারবেন যখন তার থিয়েটার বা নাটকটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকবে।
বিষয়টিকে খুব সহজে বোঝার জন্য তিনজন ভারতীয় থিয়েটার ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। সমালোচক হিসেবে আমরা কিভাবে বাদল সরকার, গিরিশ কারনাড কিংবা হাবিব তনভীরকে বুঝবো ? আর কিভাবেই বা আমরা চিহ্নিত করবো বাদল সরকার, গিরিশ কারনাড ও হাবিব তনভীরের মধ্যে তফাৎটা কোথায় ? এই তিনজনের উদাহরণ সামনে রাখার উদ্দেশ্য একটাই - তিনজনেই ভারতীয় থিয়েটারের বৃহত্তর পরিসরে সুপরিচিত, শুধু তাই নয় তিনজনেই নিজের নিজের থিয়েটারি কর্মকাণ্ডে অসম্ভব প্রতিভাধর। এমনকি তাঁদের প্রতিভা বা থিয়েটারি অবদান নিয়ে আমার কোনো দ্বন্দ্ব বা সংশয় নেই, কিন্তু একজন সমালোচককে চিহ্নিত করতে হবে আগামী প্রজন্মের কাছে এই তিনজনের থিয়েটারে অবদান কতখানি এবং তিনজনেই নিজের থিয়েটারে একে অপরের থেকে কোথায় ও কতটা স্বতন্ত্র ?
• কারনাড বনাম বাদল
একজন সমালোচকের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমি অবশ্যই গিরিশ কারনাডের তুলনায় বাদল সরকারকে প্রাধান্য দেবো। কেননা বাদল সরকার সচেতনভাবে বুর্জোয়া থিয়েটারের বিলাস-বহুল মঞ্চ পরিকাঠামো, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়াম, নানাবিধ আলোর কারিকুরি পরিত্যাগ করে মানুষের কাছে গিয়ে রাস্তায় কিংবা পার্কে নেমে অভিনয় করেছেন। তিনি জোর দিয়েছিলেন অভিনেতা ও অভিনয়ের ওপর। এমন একটা জরুরী দিক সমালোচকের চোখ এড়ানো উচিত নয় বলে আমি মনে করি।
• চরণদাস চোর না তুঘলক
অন্যদিকে যদি আমরা হাবিব তনভীরের তাৎপর্যের কথা ভাবি তাহলে কি আমরা 'চরণদাস চোর'-এর সঙ্গে 'তুঘলক'-এর তুলনা করতে পারি ? চরিত্র হিসেবে চরণদাস আর তুঘলক কি একই তাৎপর্য বহন করে ? দুটি চরিত্রই অসামান্য। কিন্তু তুঘলকের শেষ পরিণতি একটা ব্যর্থতার দিকে পৌঁছে দেয় এবং তুঘলকের সেই ব্যর্থতাকেই নাটকের মধ্যে সেলিব্রেট করা হয়েছে। আসলে এর ভেতর দিয়ে মধ্যবিত্তের ব্যর্থতাকে তুলে ধরা হচ্ছে এবং সমালোচক হিসেবে আমরা কি চেষ্টা করছি সেই ব্যর্থতা বা নেতিবাচক দিকটা প্রোজেক্ট হোক ?
আবার যদি অন্যদিকে দেখি সেখানে দেখব চরণদাস একজন চোর। কিন্তু সে কেন চোর হল ? এই চরণদাস একদিকে যেমন চোর চরিত্রে অসামান্য তেমনই অপর দিকে সে সংস্কৃত নাটকের মহান চরিত্র ধীরদত্তের মতো জীবন্ত ও প্রাণবন্ত। সে চোর হিসেবে তার শঠতাকে যেমন প্রকাশ করে তেমনি তার রাগ-অভিমান-ক্ষোভকেও উগরে দেয়। কেননা সে চোর হলেও মানুষ, আর মানুষ হিসেবে তার ভালো মন্দ সবটাই একসঙ্গে ধরা পড়ে।
• দায় দায়িত্বের চাবিকাঠি
একজন সমালোচক হিসেবে এটা মাথায় রাখা দরকার শুধু বুর্জোয়া থিয়েটার বা থার্ড থিয়েটার কিংবা আধুনিক লোক থিয়েটার নয়, নাটকের একটা চরিত্রের মধ্যে মানুষ হিসেবে তার দোষ কিংবা গুণ কতরকমভাবে ধরা পড়ছে সেটা বোঝা অত্যন্ত জরুরী।
সমালোচককে দেখতে হবে যে থিয়েটার বা নাটকটি কতখানি মানবিক অনুভূতি প্রকাশ করতে পেরেছে এবং কতরকমভাবে তা প্রকাশ পেয়েছে। সেই সঙ্গে কিভাবে নাটকের আখ্যান ব্যবহৃত বা উপস্থাপিত হয়েছে সে সম্পর্কেও সমালোচকের সজাগ দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন।
(কৃতজ্ঞতা :চন্দন চক্রবর্তী) ---- সমাপ্ত





0 Comments