খালেদ চৌধুরী তখন নার্সিংহোমে ভর্তি আছেন থেকে আজ ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি



ব্যক্তিগত একটি ঘটনার কথা বলি


ফণীভূষণ মন্ডল


৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ : খালেদ চৌধুরী তখন নার্সিংহোমে ভর্তি আছেন। মৃত্যুর মাসখানেক আগে আমার মাস্টারমশাই দেবাশিস রায়চৌধুরী আমাকে খালেদ বাবুর কাছে নিয়ে গেলেন। আমার সেই প্রথম কাছ থেকে খালেদ চৌধুরীকে দেখা। আমি বিশেষ কিছু কথা বলিনি। দেবাশিসবাবু এ-কথা সে-কথার পর বললেন - 'আপনার নাতনিকে বইটা পড়তে দিয়েছি, সে জানুক আপনি কত বড়!' এর জবাবে খালেদ চৌধুরী যে উত্তর দিয়েছিলেন, সে-কথা আমি আ-মৃত্যু ভুলবো না - 'দেবাশিস, আমাকে এত বড় করে দেখিও না'।


কথাটা আজও কানে বাজে। নিজেকে কখনো অন্যের কাছে 'বড়ো করে' দেখানোর চেষ্টা করেননি তিনি। তাঁর শিল্পকর্ম‌ই তাঁকে বড়ো করেছে। তিনি শিল্পকর্মে যেমন ফাঁকি দেননি তেমনই আপোষ‌ও করেননি। 'নিয়মের জন্য আই পি টি এ, না আই পি টি এ-এর জন্য নিয়ম?' - এই প্রশ্ন রেখেই তিনি আই পি টি এ ছেড়ে ছিলেন। এক‌ইভাবে তিনি 'বহুরূপী' ছেড়ে ছিলেন 'তাপস সেনের ব্যালান্স' না হতে চেয়ে। এই আপোষহীন মানুষ ছিলেন খালেদ চৌধুরী।


তিনি নিজেকে কোন‌ও সংকীর্ণ ধর্মের মধ্যে আটকে রাখতে চাননি। তাঁর একবার বিদেশ যাওয়ার সুযোগ আসে। কিন্তু পাসপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে ফর্ম-এ ধর্ম লিখতে হবে দেখে তিনি ঐ ফর্ম-ফিলাপ করেননি। বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা তিনি চিরদিনের মতো ত্যাগ করেন। এমন ধর্ম-নিরপেক্ষ নিরাসক্ত মানুষ সংসারে এবং শিল্পকর্মে বিরল।






'ছবি আঁকাই আমার ধর্ম' - এই দীক্ষায় নিজেকে দীক্ষিত করেছিলেন। তিনি প্রথমে স্তালিনের ছবি এঁকে খুবই প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। যদিও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বলেছিলেন - 'ছবি আঁকছ আঁকো, গানটা ছেড়ো না'। যদিও তিনি কখনো আঁকিয়ে বা গাইয়ে হননি। কিন্তু আঁকার সহজাত ক্ষমতা ও বোধ থেকে হয়েছিলেন মঞ্চ-চিত্রণের কারিগর, প্রচ্ছদ শিল্পী, প্রয়োজনে পোশাক পরিকল্পনা ও রূপসজ্জাও করেছেন এবং গান বিশেষ করে লোকসংগীতের প্রতি আকর্ষণ থেকে বহু নাটকে নির্মাণ করেছেন আবহ-সংগীত ( উল্লেখ্য 'রক্তকরবী' এবং 'স্বর্গীয় প্রহসন'), সেই সঙ্গে নানা বাদ্যযন্ত্র বাজানোর সহজাত ক্ষমতা তাঁর ছিল।



এই সমস্ত শিক্ষা তাঁর স্ব-শিক্ষা, গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি ও লোকসংস্কৃতি থেকে। এছাড়া তিনি পারিবারিক উত্তরাধিকারও পেয়েছিলেন মায়ের বাপের বাড়ির তরফ থেকে। একদিকে গুরুসদয় দত্ত ছিলেন ব্রতচারী আন্দোলনের স্রষ্টা, অন্যদিকে দিদিমা কাত্যায়নী পুরকায়স্থ ছিলেন ধামাইল নাচের প্রবক্তা। এছাড়া ছোটবেলায় 'সুরীন্দ্র'-র পালাগান তাঁকে আকর্ষণ করত। সেই সঙ্গে নৌকোপুজোয় ব্যাবহৃত সেই সব প্রেত মূর্তি, দেবদেবী ও অবতার মূর্তি তাঁকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করতো। যার ফলে তিনি একদিকে যেমন সহজাত ভাবে ছবি আঁকতে পারতেন, অন্যদিকে তেমনি গান‌ও গাইতে পারতেন।


চিরকুমার ও চিররঞ্জন থেকে শিল্পী খালেদ চৌধুরী হয়ে ওঠার নানা ঘটনা তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন এই লেখাটিতে। তাঁর এই আত্মকথনমূলন রচনাটি প্রথম প্রকাশিত হয় 'আজকাল' পত্রিকায় শারদীয় ১৪১২ বঙ্গাব্দে। এহেন একজন বহুমুখী শিল্পীর স্মৃতিধর্মী গ্রন্থটি সম্পাদনা করতে পারার জন্য আমি কৃতজ্ঞ সূত্রধর-এর সুমন ভৌমিক-এর কাছে। তাঁর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা না থাকলে এই কাজে হাত দেওয়া আমার কাছে সম্ভবপর ছিল না।



খালেদ চৌধুরী-এর আ-মৃত্যু দোসর প্রদীপ দত্ত-এর সূত্রে এই রচনাটি প্রাপ্ত। এছাড়া ব‌ইটিতে ব্যাবহৃত যাবতীয় আলোক-চিত্রের সূত্রদাতা প্রদীপ দত্ত। তাঁর কাছে আমার অসীম কৃতজ্ঞতা। ব্যক্তিগত ভাবে খালেদ চৌধুরী-এর সম্পর্কে বহু তথ্য জানতে পেরেছি দেবতোষ ঘোষ মহাশয়ের কাছে। তাঁকেও আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।


ব‌ইটি নির্মাণের ক্ষেত্রে বর্ষীয়াণ শিল্পী যুধাজিৎ সেনগুপ্ত-এর প্রচ্ছদপটের প্রশংসা না করে পারছি না। এই সঙ্গে বিশেষভাবে ধন্যবাদার্হ সূত্রধর-এর বর্ণসংশোধক নিমাই দে সহ অন্যান্য কর্মীবন্ধুকে।


(খালেদ চৌধুরী সম্পর্কিত বিশেষ একটি বইয়ে ফণিভূষণ মন্ডল এই কথাগুলি লিখেছিলেন, বইটির নাম এবং প্রকাশনার তথ্য নিচে দেওয়া হল)








Post a Comment

0 Comments