থিয়েটারে এ চিৎকার শোনা যাচ্ছে অরু দা, বিভা দা, মেঘা দা, সীমু দিইই, অসি দা...



অশোক ঘোষ

(নির্দেশক, থিয়েটার্স ওয়ার্কাস)


ত্রিশ পঁয়ত্রিশ দিন হতে চললো লক ডাউন চলছে । একা মানুষ বড় অসহায়, সেই যে ২৩ তারিখ রাতে ঘরে ঢুকেছে আজও সেভাবেই ঘর যাপন চলছে !টুকটাক বাজার করা, বেঁচে থাকবার প্রয়োজনে খাবার খাওয়া, মনের ক্ষিদে মেটানোর জন্যে টিভিতে সিনেমা, নেট অন করে গান শোনা বা পুরনো বাংলা ছবি দেখা সহ মোবাইল এ বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজনের খোঁজ নেওয়া । একটা বেশ অন্য রকম মজা হচ্ছিলো, কেউ কেউ এই অবসরে পুরনো কিছু বই তাক থেকে নামিয়ে পড়া এবং সেটা নিয়ে প্রেমিকা, বান্ধবী, বন্ধু, প্রেমিক, সহকর্মী দের সাথে আলোচনা, থিয়েটার চর্চা, রাজনীতির চর্চা, নানান রেসিপি বানিয়ে খাওয়া (যাদের সঙ্গতিi আছে ) ফেইসবুক এ প্লেট সাজানো খাবারের ছবি সহ ঘরবন্দীর সেলফি পোষ্ট করা, কেউ আবার উৎপল দত্তের নাটক পাঠ করে, গান করে, আবৃত্তি করে, ঘরবন্দী মানুষ কে আনন্দ প্রদানের মধ্য দিয়ে নিজের মনের সাংস্কৃতিক চাহিদা মেটাতেই এতটা জার্নি করে চলেছে ।



পড়ুন - শম্ভু মিত্র : নাট্যের ভাষা লেখক : অধ্যাপক সৌমিত্র বসু



 সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে রাত, আবার সকাল !
সুদিপার এ ভাবেই কেটে যাচ্ছিলো, প্রথম দুটো সপ্তাহ সন্ধ্যে হলেই মদ্যপায়ীদের মতো ছটপট করে উঠছিলো, রিহার্সাল এর জন্যে ! কিছুতেই নিজেকে ঠিক রাখতে পারছিলো না ! নাট্যদলের ডিরেক্টরকে ফোন করা, দলের অন্যান্যদের সাথে কথা বলে কিছুটা শান্ত হয়েছিল ! মোটামুটি একটা অভ্যস্ততা গড়ে তুলেছিল সুদিপা চন্দননগরের বাড়িতে বসে ! বাবা কলকাতায় চাকরি করতে আসে ! এখনতো বাড়িতেই বসা ! ওদিকে ছোটোবোনের কলেজ বন্ধ, দাদা টালিগঞ্জ এর কোন একটা হাউসে এসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টরের কাজ করে, ও বাড়িতে  বিদেশী ছবি দেখেই সময় কাটাচ্ছে ! বোন তো তার বন্ধু আর একান্ত মনের মানুষের সঙ্গে ভিডিও কল করেই সময় কাটাচ্ছে ।





কিন্তু আজ সকাল থেকে কী হোলো ! বাড়ির সবাইকে একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে সুদিপার 
!কেউ কোনো কথা বলছে না !চুপচাপ ! যে যার মতো খাচ্ছে, কাজ করছে ! ফোন এলেও যেন কথা বলতে অনীহা । তখন থেকে ড্রেসিং টেবিল এ থাকা বোনের ফোনটা বেজে চলেছে । সুদীপা গিয়ে ফোন টা তুলে দেখে বোনের বন্ধু । এগিয়ে গিয়ে বোনের হাতে ফোনটা দিল, অদূরে সোফাটায় হেলান দিয়ে একটা ম্যাগাজিন হাতে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে সুদিপা  ভাবছে, বাড়ির লোকগুলোর আজ হোলো কী !


পড়ুন - ১০০০ টাকা ভাতা কিভাবে পাবেন ? নিয়মাবলী ও ফরম পূরণের পদ্ধতি একবার চোখ বুলিয়ে নিন


কেউ কোনো কথা বলছে না  ! বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে সুদিপার, তার নিজের মুখেও কোনো কথা নেই ! শুধু ভাবছে, মানুষ কী প্রকৃতই নিরালম্ব হয়ে যাচ্ছে !পরিপার্শ্বের জলহাওয়া থেকে রস টেনে বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় যে নিবিড় সংলগ্নতা ছিল তা কী নষ্ট করে দিচ্ছে এই একাকিত্ব !সামাজিক অখণ্ডতায় মিলে মিশে মানুষের দেশজ বৈশিষ্ট গড়ে ওঠে, গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক বোধ, তা কী জানলা দরজার মতো মানুষকে  বাড়িতে লেপ্টে থাকা নির্দেশের সুতীব্র আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন করে শিকড় হীন করে দিচ্ছে ! হাহাকার করে উঠছে সুদিপার মন, কেউ কোনো কথা বলছে না অথচ চা, জলখাবার খাওয়া থেকে, স্নান করা মধ্যাহ্ন ভোজন কোনো কিছুরই কোনো ব্যতিক্রম নেই !শুধু বাকরুদ্ধ সবাই !!! তার নিজের মুখেও কোনো কথা নেই... 



কেন, কেন, কেন ! অণুজীবানু গ্রাস করার রুদ্ধশ্বাস ঘটনার আকস্মিকতায় মূক হয়ে যাচ্ছে মানুষ ! পঁয়ত্রিশটা কালোদিন  রাত্রির একাকিত্ব কী দেশজ ঐতিহ্য, মূল্যবোধ আর মননের পরম্পরা থেকে ছিটকে দিচ্ছে মানুষ কে, মানুষ কী আগন্তুক হয়ে উঠছে সমাজের কাছে নাকি নিজের অস্তিত্বের কাছেও !সমস্ত অতীত ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অনতিক্রম্য দূরত্বে চলে যাচ্ছে তার গোটা পরিবার, সমাজ ! তবে কী দুরন্ত কোনো এক সকালে বিপরীত কোনো জীবনচর্যার কাছে তীব্র অতৃপ্তিতে হাঁটু মুড়ে বসতে হবে সবাইকে, আঁতকে ওঠে সুদিপা । মনে মনে ভাবে গোটা পরিবারের নিশ্চুপ হয়ে যাওয়া মানে কী অধঃপতনের ইঙ্গিত ? ছুটে গিয়ে পাশের ঘর থেকে হারমোনিয়ামটা টেনে বের করে ড্রয়ইংরূম এ চিৎকার দিয়ে গান ধরে, বাড়ির লোকেদের কারো কোনো হেলদোল নেই !এবার সুদিপা চিৎকার দিয়ে উঠলো 'তোমরা কথা বলছো না কেন.... কী হোলো তোমাদের  ? '
না, সুদিপা চিৎকার করে কথাগুলো বলবে ভেবেছিলো । কিন্তু  গলা দিয়ে একটা শব্দও বেরোচ্ছিলোনা, ওর  থিয়েটার তো বাঁচবার স্বপ্ন দেখায় । অন্ধকারে আলো দেয়, পথ দেখায় । হঠাৎ সুদিপা বাড়ির ছাদে উঠে গেল । পড়ন্ত রোদে আশেপাশের ছাদ গুলোতেও লোকজন, কোনো কোনো ছাদ থেকে ঘুড়ি বেড়েছে, ও লক্ষ করলো তারাও কেউ কথা বলছে না । 



সুদিপা চিৎকার দিয়ে পাশের ছাদের অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলো কিন্তু গলা দিয়ে একটা শব্দও বেরোলোনা । অগত্যা কলকাতা থিয়েটার এর প্রথিতযশা পরিচালকদের নাম ধরে চিৎকার দিতে থাকলো । হ্যাঁ এবার আওয়াজ বেরোলো ।
"অরু দাআআআ...... বিভা দাআআআআ..... মেঘা দাআআআ.... সীমু দিইইইইইইই........অসি দাআআআআআ....."

এবার সুতীব্র চিৎকার দিতে থাকলো একটানা... আশেপাশের ছাদ থেকে সবাই চিৎকার দিচ্ছে । ঘুড়ি নামিয়ে ছোটরাও চিৎকারে গলা মেলাচ্ছে, সিঁড়ি দিয়ে সুদিপার বাবা,মা, দাদা, বোন উঠে এসে চিৎকার দিচ্ছে আর তাদের চোখ দিয়ে জল পড়ছে ! সুদিপা গান ধরে
 'এসো মুক্ত করো মুক্ত করো অন্ধকারের এই দ্বার, এসো শিল্পী, এসো বিশ্বকর্মা এসো স্রষ্টা, রসরূপ মন্ত্র দ্রষ্টা,  ছিন্ন করো ছিন্ন করো বন্ধনের এ অন্ধকার ।''
সবাই সুদিপার সাথে গলা দেয় !


আকাশে সাতরঙা রামধনুর আলো বিচ্ছুরিত হয় ওদের চোখে মুখে !



(নিস্তব্ধ দেশ এক মাস পার করল । একে একে হারিয়ে যাচ্ছে প্রিয় মানুষেরা । শেষ যাত্রায় তাদেরকে একবার দেখবার সুযোগও নেই । শিল্পীরা ও সাধারন মানুষেরা ঘরে বসে আর কতদিন... কল্পনার পৃথিবীতেই কিছুটা স্বস্তির খোঁজ)







Post a Comment

0 Comments