নাট্যচর্চা ও প্রচার মাধ্যম
সত্য জিৎ : বর্তমানে সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া মানুষের প্রত্যাশার জায়গা । প্রত্যাশা পূরণ হবে কি হবে না সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ । এই প্রসঙ্গে প্রবাদপ্রতিম পুরুষ কাঙাল হরিনাথের কথাও উল্লেখ করা যাক । তিনি ছিলেন গ্রামীণ সাংবাদিকতার জনক । নিজ উদ্যোগ ও চেষ্টায় প্রকাশ করেছিলেন ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকা। ১৮৬৩ সালের বৈশাখ মাসে এই পত্রিকা প্রথমে কলকাতা থেকে মাসিক হিসেবে প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে বাইশ বছর ধরে একজন মানুষ তাঁর শ্রম, মেধা, বিবেচনা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি অসাধারণ ভালোবাসা নিয়ে প্রত্রিকাটি প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছিলেন।
গ্রামবর্ত্তার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জনৈক গ্রামবাসী ১৮৯১ সালে ‘হিতকরী’ পত্রিকায় একটি চিঠি লিখে বলেছিলেন,
'‘আজ কয়েক বছর হতে গ্রামবার্ত্তার কণ্ঠ নীরব হইয়াছে। গ্রামবার্ত্তার সতেজ লেখনী প্রভাবে এ অঞ্চলের পুলিশ, বিচারক, হাকিম, মিউনিসিপ্যাল কমিশনার, জমিদার প্রভৃতির অত্যাচার শান্ত ভাব ধারণ করিয়াছিল । গ্রামবার্ত্তার জীবন এই সমস্ত অত্যাচার কাহিনী প্রকাশে অনেক সময়েই নানা বিপদে পড়িতে হইয়াছিল, যে তাহার আর উল্লেখের প্রয়োজন নাই ।… পূর্বে যখনই দুঃখ পাইতাম তখনই গরিবের দুঃখে দুঃখী, কান্নার সমভাগী গ্রামবার্ত্তার দ্বারে গিয়া কতো বার কাঁদিতাম । …কিন্তু এখন কাহার কাছে যাইব ?’'
১৮৯১ সালে জৈনক ব্যক্তির সেই হতাশার চিত্র আজ যে কিছুটা হলেও সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে লাঘব হয়েছে, তা কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না | কারন আজ নিজের কথা অনেক মানুষকে বলবার জন্য আমাদেরকে আর কোন মিডিয়ার ওপর ভরসা করতে হয় না | একই সাথে বলা যায়, যে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ আজও মানবিক বোধ শিক্ষার দিক থেকে নিরক্ষর, সে দেশে হাজার হাজার বছর ধরে নাট্যচর্চার একটি বিপুল ভূমিকা জনগণকে প্রভাবিত করেই চলেছে । আর এই চর্চা যদি প্রকৃত অর্থেই সৎ, নিরপেক্ষ, এবং জোটবদ্ধ হওয়ার ভূমিকা পালন করে, এর বহুমাত্রিক দিক যদি মানুষের বেঁচে থাকাকে অর্থবহ জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, তবে ২০১৯ সালে দাঁড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকাকেও অস্বীকার করা ভুল হবে যদি সেই ব্যবহার সৎ এবং নিরপেক্ষ করে তোলা যায় | হয়ত ১৮৯১ সালের সেই জৈনক ব্যক্তিরাই বর্তমান সময়ে হয়ে উঠবেন এক একটি গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা'র সম্পাদক |
এক সময় আমাদের বাংলা থিয়েটারের এক একটি জায়গার এক একটি বিশেষ বৈশিষ্ট ছিলো যেমন বালুরঘাটের নাট্যচর্চা, মুর্শিদাবাদের নাট্যচর্চা, বীরভূমের নাট্যচর্চা, গোবরডাঙার নাট্যচর্চা ইত্যাদি | কিন্তু সেই বিশেষ নাট্যচর্চার বর্তমান অভিমুখ আজ কোলকাতামুখি কেন ?
এক সময়ে বাংলা থিয়েটারে গিরিশ ঘোষ, শিশির ভাদুড়ী থেকে শুরু করে শম্ভু মিত্র, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, বিভাস চক্রবর্ত্তী, অরুন মুখার্জী, অশোক মুখার্জীরা ছিলেন, যারা ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর কাছে বাংলা থিয়েটার এর মুখ হয়ে সামনে দাঁড়াতেন | বর্তমান সময়ে এমন মুখ নেই কেন ? সমস্ত কর্পোরেট নামি মিডিয়া গুলি গুটি কয়েক স্বার্থান্বেষী নাট্যজনের ছত্রছায়ায় মুখ গুঁজে থিয়েটার চর্চার বিরাট পরিসরকে প্রায় অস্বীকার করেই চলেছে কেন ?
প্রশ্ন তো আছে অনেক, কিন্তু জবাব দেবে কে ?
নাটক মানুষকে ভাবতে শেখায়, চিন্তার জগৎ এ প্রবেশ করায়, আর তখনই মানুষ প্রশ্ন করতে শুরু করে | তাই নাট্যচর্চার প্রসার ও প্রচার উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ | তাই নাটকের প্রচার যদি আমি চেঁচিয়ে করি তবে দশটি লোক শুনবে, যদি মাইক বাজিয়ে করি তবে একশোটি লোক শুনবে, আর যদি বিশেষ মিডিয়া গুলিকে ব্যবহার করি তবে হাজার হাজার মানুষ শুনবে, যার মধ্যে বিশেষ ভাবে সহজ লভ্য সোশ্যাল মিডিয়া | ২০১৯ সালের এই আধুনিক যুগে এই মিডিয়াকে সৎ এবং নিরপেক্ষ ভাবে ব্যবহার করতে পারলে ঘটে যেতে পারে অনেক সুন্দর ঘটনা | নাটক মানুষকে চিন্তার জগৎ এ নিয়ে যাক, সমস্ত স্বার্থান্বেষী মানুষের বিরুদ্ধে প্রশ্ন করতে শেখাক, আর সেই নাটকের বার্তা পৌছে দিতে ব্যবহার হোক সেল্ফ মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়া |
(বহরমপুর 'নবীণ' এর বার্ষিক পত্রিকায় প্রকাশিত আমার ছোট্ট লেখা | ধন্যবাদ সৈদাবাদ 'নবীন' নাট্য সংস্থা )
মতামত লিখুন নিচের কমেন্ট সেকশনে ।


0 Comments