অশোক ঘোষ
(নির্দেশক, থিয়েটার্স ওয়ার্কাস)
অনেকদিন পর আজ বেরোলাম, কলকাতায় লকডাউন কিছুটা শিথিল হয়েছে ! সুকিয়া মোড়ে এসে সুরেনের এক কাপ চা মেরেই বাইকে কিক, সোজা সারকুলার রোড ধরে মৌলালী দিয়ে ঢুকে ধর্মতলা হয়ে, পার্ক স্ট্র্রিট ফ্লাই ওভার হয়ে একাডেমী র সামনে ! প্রায় ফাঁকা, এদিক ওদিক দু এক জোড়া ছেলে মেয়ে কে দেখা যাচ্ছে, অনেক দিন পর দেখা কিন্তু কিরকম প্রাণহীন মনে হচ্ছে ! সেলাম ঠোকার কেউ নেই আজ ! তালা বিহীন গেট ! মাথায় কী ভুত চাপলো কে জানে, ভিতরে ঢুকে একে একে সব দলের শো বোর্ড গুলো এনে সাজাতে লাগলাম ! ও বাবা আমার ভেতরের মানুষ টা বেমালুম আমায় বাধা দিতে থাকলো ৷ 'কী হচ্ছে টা কী, শো নেই, কিছু নেই, শুধুশুধু এগুলো লাগিয়ে কী লাভ ?
বেশ করছি, বেশি কথা বোলোনা তো !
...'আরে আবার এগুলো তুলতে হবে তো না কী !'
...তুলবো ৷
... 'তাহলে লাগিয়ে লাভ কী ? '
একটু পরে দেখবে লাভ কী !
মনে মনে এবার ভাবতে লাগলাম যে এতগুলো বোর্ড আবার তুলতে হবে.. !সে তুলে দোবো !আচ্ছা জানলার শো কার্ড গুলো ঝোলাবো, না থাক !
পকেট থেকে মোবাইল বের করে একাডেমী র মুখে সব কটা নাটকের বোর্ড এর ছবি তুললাম ! সাথে শো বোর্ড গুলোকে পিছনে রেখে একটা সেলফি তুললাম ! কী অসাধারণ লাগছে দেখতে, দুধারে সারি বদ্ধ বোর্ড যেন খুশি ছড়াচ্ছে, গাছ গাছালির পাখি গুলো কিচির মিচির করছে ! গাড়ি ঘোড়া দুমাস বন্ধ ছিল গাছের পাতা গুলো ঝকঝকে সবুজের বন্যা ছড়াচ্ছে ! যেন দীর্ঘদিন পর ঘুম থেকে জেগে উঠেছে গাছগাছালি ৷
আমি দুবার লাফিয়ে উঠলাম, অজান্তে মুখ দিয়ে আনন্দের চিৎকার বেরিয়ে এলো ৷ দু একজন এসে জিজ্ঞাসা করছে, হল খুলবে কিনা, কবে থেকে চালু হবে নাট্য !
আমি বিজ্ঞদের মতো বললাম হবে হবে, খুব শীঘ্রই চালু হবে, জীবন যেদিন পূর্ণোদ্যমে চালু হবে ৷ সেদিন সেই জীবন কে রসদ জোগাতে থিয়েটার চালু করতেই হবে ৷ হলে, হলের বাইরে, মাঠে ময়দানে, নন্দন চত্বরে, অফিসপাড়ার টিফিন বিরতিতে কারখানার গেটে সর্বত্র সর্বত্র !
'বড্ড বাজে বকা হচ্ছে, এবার তোল বোর্ড গুলো !
'না থাক, দেখি না কী হয়... কিছু লোক তো এগুলো দেখছে, দেখুক, আমি ততক্ষন রবীন্দ্র সদন, আর নন্দন এর সামনে থেকে ঘুড়ে আসি !!
পড়ুন - একাডেমি চত্বরে রক্ত, গেটে খালেদ চৌধুরী, তাপস সেন - থিয়েটার জগৎ এ শোরগোল
হরি খোলা, রাজু বন্ধ ৷ কী কান্ড ছোটো গেট টা খোলা দেখে টুক করে ঢুকে পড়লাম ৷ না মনীষীদের ছবির পসরা নিয়ে যারা বসেন, তারা বসেননি !এগোলাম, আরে ওইতো ঝালমুড়ি লোকটা সবে মাথা থেকে নামালো, আমি গিয়ে তার কুশল জিজ্ঞাসা করলাম !যা বললো তা শুনে মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল ! অবাঙালি ভদ্রলোক এর রুজি এই মশলা মুড়ি বেচা, দুমাস কোনো রোজগার ছিলোনা, কলুটোলায় থাকে ৷ বাড়িতে বিবি আর এক ছেলে এক মেয়ে ! বছর বারোর ছেলেটা জন্মান্ধ, মেয়ে টা ছোটো, পাঁচ কেলাসে পরে ! দশ টাকার মুড়ি কিনে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সদন চত্বরে রবি ঠাকুরের মূর্তির নিচে বসলাম !কোনো কড়াকড়ি নেই, সিকিউরিটি, পুলিশ কিছু নেই, আপাত শান্ত... অভ্যাস বসতো মুড়ির ঠোঙা টাকে মুখে ঠেকিয়ে ফুঁ দিয়ে হাওয়া ভর্তি করে দু হাতের তালু তে মারতেই দুম ফটাস ৷ অদূরে প্রেয়সী তার প্রেমিকের কাঁধে মাথা দিয়ে... ওদের প্রেমালাপে ব্যাঘাত ঘটলো, দুঃখপ্রকাশের ভঙ্গিমায় তাকালাম, হাত নেড়ে বোঝাতে চাইলো ঠিক আছে.. হেলান দিয়ে দুহাত প্রসারিত করে রবীন্দ্র সদনের মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখতে লাগলাম, চোখে ভেসে এলো রাশিয়ার বলশয় থিয়েটার...
রাশিয়ার সাংস্কৃতিক সৃজনশীলতার অপরূপ সৌন্দর্য বলশয় থিয়েটার সারা বিশ্বের শিল্প রসিকদের মুগ্ধ বিস্ময়ে অভিভূত করে রেখেছিলো !বলশয় মানে বিশালকায়, রাজকীয়!চাইকোভোসকির 'ইউজিন ওনেজিন'সিমফনিতে বলশয় কে দেখে অভিভূত হয়নি কিংবা 'সোয়ান লেক ' এর রাজ হংশির উড়ানের অপরূপ ভঙ্গিমায় রোমান্চিত হন নি, পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই !
সর্ব অর্থে বলশয় থিয়েটার ছিল বিশালকায় প্রাসাদোপম প্রেক্ষাগৃহ, চারটি অলিন্দে প্রায় পাঁচ হাজার দর্শক এর আসন !বাইরে নানা রঙের বর্ণময় ফুলের বাগান, ফোয়ারা,, মর্মর মূর্তির অপরূপ ভঙ্গিমা আর ধনুকএর ছিলার মত,রাজহংসির অনন্য গ্রীবার মত বলশয় শিল্পীদের কলতান সমাজতান্ত্রিক শিল্পের অনিন্দ্য সুন্দর সৃজনের শ্রেষ্ঠত্তে সারা দুনিয়া কে অভিভূত রেখেছিল!
উদ্বাস্তু শিল্পী রা এখন হোটেলের নাচঘর থেকে শরীরী মালিননের ব্যাধিগ্রস্থ বিভঙ্গ শিখছেন ! পরিপূর্ণ ভাবে lockdown উঠে গেলেও, এখানে সিনেমা হল, থিয়েটার প্রেক্ষাগৃহ চালু হবে না, তো কী হবে থিয়েটার সহ সিনেমা শিল্পের সাথে যুক্ত শিল্পী কলাকুশোলিদের ভবিষ্যত.... ধর মরিয়ে উঠে পড়লাম.... তপনের অজিত টা তো মুখ গুঁজে পরে থাকে হলে, রাতে শুধু বাড়িতে শুতে যেত ! অনেক দিন ওর সাথে দেখা হয়নি.... বাইকে উঠলাম, তপন থিয়েটার এ যাবো বলে কিন্তু মন টা যেন হাহাকার করে উঠলো...ভারতবর্ষ তথা কলকাতার থিয়েটার এর ভবিষ্যৎ টা রাশিয়ার বলশয় থিয়েটার এর মতো হবে নাতো...... বিষন্ন মনে তপনের সামনে গিয়ে অজিত কে বুকে জড়িয়ে ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললাম..
'কী হোলো রে তোর কাঁদছিস কেন, পাগল ! এবার আসতে আসতে সব খুলবে !
আমাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেও সান্ত্বনা খুঁজছে,আসলে সবাই ভাবছে আজ... কাল... বা পরশু সব স্বাভাবিক হবে... তখন থিয়েটার কী মুখ বন্ধ করে গুমরে মরবে !!!! সত্যি থিয়েটার... খুলবে !আবার স্প্রিড গামএর গন্ধ, থার্ড বেল......দেখা যাক, আশায় বাঁচে চাচা !খুলবে তো ? লাখ টাকার প্রশ্ন !
.
(নিস্তব্ধ দেশ এক মাস পার করল । একে একে হারিয়ে যাচ্ছে প্রিয় মানুষেরা । শেষ যাত্রায় তাদেরকে একবার দেখবার সুযোগও নেই । শিল্পীরা ও সাধারন মানুষেরা ঘরে বসে আর কতদিন... কল্পনার পৃথিবীতেই কিছুটা স্বস্তির খোঁজ)





1 Comments