কেরালা তিলে নাটকঙগুলাডা
সুলগ্না চক্রবর্তী
কেরালা : আমাদের বাংলা ভাষায় প্রবাদ আছে ' কৈ মাছের জান।' ইংরেজীতে প্রায় একই অর্থে বলা হয় - 'Like phoenix bird' এই পাখি নাকি নিজের ছাই থেকে আবার জন্ম নেয়। এই দুই প্রবাদ কে যদি একসাথে কোনো শিল্পকলার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায় তা নাটক হতে বাধ্য। প্রাচীন বাংলার নাট্যশিল্পী অস্পৃর্শ'নেটো'দের মৃত্যুর পর পোড়ানোর লোক পাওয়া যেত না। লোক যদিবা পাওয়া যায় ভালো শ্মশানভূমিতে তাদের মৃতদেহ ঢুকতে দেওয়া হত না। তবু বুকে পাথর চাপিয়ে টিকিয়ে রেখে ছিল নাটকের প্রজ্বলিত শিখা। এর পর অনেক যুগ পেরিয়ে গেছে। এসে গেছে মধ্যযুগের শেষ পর্ব। সেখানেও লোকেরা নাটক দেখে স্নান করতো। তার পরেই নাকি তাদের 'পাপমুক্তি' হত। আধুনিক যুগেও দেখতে পাই 'বেঙ্গল থিয়েটার' কে ঘিরে বিদ্রুপ, সমালোচনা ও কটাক্ষ। আর হবে নাই বা কেন? চার-চার জন মহিলা কে নাটক করার সুযোগ দিয়ে তারা সমা
ভারতের উত্তর থেকে দক্ষিণে এই চিত্র প্রায় একই। জাতের নামে, চরিত্রের ধুয়ো তুলে, ধর্মের ধ্বজা দেখিয়ে বারে - বারে নাট্যকলাকে আক্রমণ করা হয়েছে, রক্তাক্ত করা হয়েছে, খুন করা হয়েছে। অথচ ফিনিক্স পাখির মতো নিজের ছাই থেকে সে বেঁচে উঠেছে। ব্রাহ্মণদের লালচোখ কেরালার দলিতদের মন্দিরের সংস্কৃত নাটক 'কুট্টিয়াম' করতে দেয়নি অন্তজ বলে । গীতগোবিন্দের মধুর গান 'কৃষ্ণাষ্টম' করতে করতে শুনেছে বিদ্রুপ। তাই তারা চলে গেছে বনের ভিতর খালি জায়গায়, যেখানে শুধু তাদের মত তথাকথিত নিচু লোকেরা থাকে। আর শুরু করেছে 'থাইয়াম'। এই থাইয়াম অন্তজদের বেঁচে থাকার লড়াই, হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য লড়াই, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার লড়াই থেকে শুরু হয়েছে। উত্তর কেরালা ও দক্ষিণ কর্ণাটকের এই 'থাইয়াম' নাট্যকলা এখন আবার এক নতুন যুদ্ধের জন্য তৈরি হচ্ছে। আওয়াজ উঠেছে নতুন বিপদকে রুখে দেওয়ার জন্য। নাটকের কুশীলবরা আবার যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। আবার চন্ডা বেজে উঠেছে মানে ড্রাম বেজে উঠেছে এই 'অসাংস্কৃতিক' লোকগুলোকে ঘিরে। থাইয়ামের শিল্পীরা আর্য হতে চায় না তারা দ্রাবিড় নাট্যধারা নিয়েই বেঁচে থাকতে চায়। তাদের দাবি, বৈশিষ্ট্য, তাদের সংস্কৃতায়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানো নিয়েই 'কেরালা তিলে তিলে নাটকঙগুলাডা'। কেরালার নাটক। থাইয়াম সম্বন্ধে কিছু লেখার আগে কেরালার আরো দুটি প্রাচীন নাট্যধারা সম্বন্ধে কিছু বলবো। এর ফলে দ্রাবিড় আর্য, ব্রাহ্মন - অব্রাহ্মন, সংস্কৃতি অপসংস্কৃতির মধ্যে যারা খেলা করে তাদের প্রকৃত রূপ দেখানো সহজ হবে। কেরালার আর্থ সামাজিক ক্রবর্ধমান অবস্থার সঙ্গে নাটকের সম্পর্কটাও খানিকটা জানাও যাবে।
প্রথমে কুট্টিয়াম নিয়ে বলবো এই কারণেই যে এটি সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশের নাটকের জীবন্ত ফসিল। হাজার বছরের পুরোনো আর এক নাট্যকলা বেঁচে আছে ইন্দোনেশিয়ায়। কেরালার প্রাচীন নাট্যধারা কুট্টিয়াম UNESCO থেকে স্বীকৃতিও পেয়েছে। এটি সংস্কৃত নাটকের আদি ধারা। আসলে এটির নাম কুট্টি আট্যম। সেই থেকেই কুট্টিয়াম এসেছে। এই নাটক মন্দিরের ভিতরেই এতকাল ধরে হয়েছে, এখন মন্দিরের বাইরেও হচ্ছে। এই নাটকের বাক্যালাপ সংস্কৃত ভাষায় হয়। আর উঁচু জাতের লোকেরাই এর কলাকুশলী। এই নাটকের movement খুব আস্তে আস্তে হয়। ধরা যাক শকুন্তলা চুল আচড়াচ্ছে বা ফুলের মালা গাঁথচে - এটা স্বাভাবিক ভাবে যা সময় নিয়ে হয় মঞ্চের ওপর তাই দেখানো হয়। নাটকের এক এক অঙ্ক দেখাতে এক এক রাত লাগে। একটা পুরো নাটক দেখতে এক সপ্তাহ লাগে। আগে নাকি চল্লিশ রাত ধরে দেখানো হত তা কমে চল্লিশ ঘণ্টা হয়েছে।
আমাদের বাংলাতে যেমন যারা ঠাকুরের মূর্তি করে তাদের পাল বলা হয়, যারা বিয়ের সম্বন্ধ্য করে তাদের ঘটক বলা হয়, তেমন এই নাটক যারা করে তাদের চাকক্কিয়াড় বলা হয়। এই নাটকে একটা কমিক চরিত্র থাকে। এই চরিত্র হাসির মোড়কে সমাজের অনেক সত্যি কথা সামনে বসে থাকা ক্ষমতাবানদের নির্ভয়ে বলে দেয়। এই নাটকে মাথায় মুকুটের ব্যবহার হলেও মুখে মুখোশ পরা হয় না। মন্দিরের ভিতর রাজন মানে ক্ষত্রিয়রা, ধনী বৈশ্যরা, আর ব্রাম্ভনরা এই নাটক দেখার সুযোগ পেত। দর্শক কাছাকাছি বসে থাকত কলাকুশলীদের অভিনয় দেখতে, মুখের অভিব্যক্তি দেখতে। তাই মুখোশ কখনোই পরা হত না। অথবা শরীরকে ফুলিয়ে বড়ো করে দেখানো হতো না, আজও হয় না। তবে পরিবর্তন যেটা হয়েছে সেটা হল মন্দিরের বাইরেও এই নাটক এখন অভিনীত হয় এবং নাটকের সময়কাল অনেক কমে গেছে।
আরেকটি আর্যকলা আছে কেরালার নাট্যধারায় এটির নাম কৃষ্ণাআট্টাম। এটি বিখ্যাত গুরুভাউর মন্দির প্রাঙ্গণে নিয়মিতভাবে অভিনীত হয়। এখানে কৃষ্ণর জীবন আট অঙ্কে দেখানো হয়। এক এক দিনে কেবল এক অঙ্কই হয়। এই নাটক মন্দিরের গর্ভ গৃহের দরজা বন্ধ হবার পরই শুরু হয়। কলাকুশলীরা মুখোশ ব্যবহার করে। শোনা যায় মন্দিরে অভিনীত হবার সময় চরিত্ররা হাতে প্রদীপ নিয়ে মঞ্চে উঠে ও নিজেদের চরিত্র মুখাভিনয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত করে। এই নাটক ও মন্দিরের বাইরে হত না। ইদানিং কুড়ি তিরিশ বছর অবশ্য এটি মন্দিরের বাইরেও হচ্ছে। বলা বাহুল্য কুট্টিয়ামের মতো এটি সমাজের উচ্চ স্তরের লোকেদের নাট্যকলা।
থাইয়ামের অবস্থান এই দুই নাট্যকলার একেবারে উল্টো। এটি নিচু স্তরের মানুষের দ্বারাই অভিনীত হয়। আর যদি প্রাচীনতার প্রশ্ন আসে তাহলে সঙ্গম সাহিত্যের কথা বলা যেতে পারে। সঙ্গম সাহিত্য হাজার বছরেরও পুরোনো সাহিত্য এবং এখানে থাইয়ামের কথা আছে। থাইয়াম নাট্যধারা উত্তর কেরালা ও দক্ষিণ কর্নাটকেই দেখা যায়, অন্য স্থানে নয়। আগে এই কলাকে তাচ্ছিল্য করে বলা হতো 'ভুত-কলা'। ভূতেরা নাকি এই নাটক করে। না আছে বড়ো উঁচু মঞ্চ, না বড়ো বড়ো সংস্কৃতে সংলাপ, না দামী পোশাক-পরিচ্ছদ। এই নাটক বড়ো অদ্ভুত। নটনটীরা এসে দর্শকদের সামনে নাটক শুরুর আগে সাড়ি দিয়ে দাড়ায়। নাটকের গল্প নিয়ে, চরিত্র নিয়ে কলাকুশলীদের সাথে দর্শকদের আলোচনা হয়। দর্শকরা নাটকের চরিত্র গুলো কেমন ভাবে দেখতে চায় তা নিয়ে মতামত দেয়। এরপর কলাকুশলীরা মেকাপ নিয়ে যায়। মেকাপ নিয়ে শুরু হয় নাটক। মেকাপের কথা বলতে গেলে সবার আগে যেটা আসে তা হল প্রকৃতির বিভিন্ন দান যেমন ফল, ফুল, ডালপালা, কাঁটা, গাছের ছালের সুচারু প্রয়োগ। এরা রামায়ণ মহাভারত নয় বরঞ্চ লৌকিক গল্প ধরে নাটক করে। লৌকিক গল্পে যে দেবতা সাজে তাকে দর্শকরা দর্শক আসন থেকেই হাত তুলে প্রণাম করে। নাটকের শেষে কলাকুশলীরা দর্শকদের সুখ শান্তির জন্য আশীর্বাদ করে।
কেরালাতে প্রায় পাঁচশো থাইয়াম দল আছে। এরা অগাষ্ট মাস নাগাদ বিভিন্ন জায়গা থেকে নাটক করার বায়না পেতে শুরু করে। এই সময়ে তথাকথিত নীচু জাতের লোকেদের ঘরে-ঘরে ভগবতী-সরস্বতীর পূজাও হয়। থাইয়াম শিল্পীরা ভগবতী দেবীর কাছে প্রার্থনা করেই নাটক করতে যায়। মুসলিমরাও ভগবতীর কাছে দোঁয়া মাঙে তবে ভগবতী দেবী তখন ভগবতী বিবি। কেরালার কাশারাগড় অঞ্চলে মুসলিম থাইয়াম খুব জনপ্রিয়। আরেকটা অদ্ভুত রীতি হলো নাটকের আগের দিন অধিকারীরা উপবাস করে।
ঐতিহাসিকরা বলে কাশারাগড় অঞ্চলে এক কালে অনেক জৈন ধর্মের লোকেরা থাকতো। মুসলিম ধর্মের ওপর জৈন ধর্মের প্রভাব নাকি সেই থেকেই। আমাদের বাংলায় তো নাট্যমেলা হয়, অনেক নাট্যগোষ্ঠীর মিলন হয়। কিন্তু কুম্ভমেলার মতো একটা চক্র হয় কি? থাইয়ামে বারো বছর অন্তর একটা চক্র হয়। পূর্ণকুম্ভের মতো এই নাট্যমেলাকে বলা হয় পেরুম কালিয়াট্টম। সারা পৃথিবী থেকে লোকেরা আসে এই পেলুম কালিয়াট্টম দেখতে। ২০০৮ সালে শেষ হয়ে ছিল, ২০১৯ এ আবার হবে। নাচ গান অভিনয় নিয়ে এই নাটক আজ সব জাত ধর্মের লোক টানে এবং লোকেরাও স্থানীয় ইতিহাস ভূগোল জানতে পারে। ইদানিং এই নাটকে একটা পরিবর্তন আসছে। নাটকে তথাকথিত 'সভ্য ও আধুনিক' করার একটা প্রচেষ্টা যেন শুরু হয়ে গেছে। নাটকের প্রধান চরিত্ররা ব্রাক্ষ্মণ হচ্ছে, লোকায়ত গল্প ছেড়ে রামায়ণ মহাভারতের চেনা গল্প নেওয়া হচ্ছে। চরিত্ররা স্থানীয় কথ্য ভাষা নয়, শহুরে মালয়ালী ভাষায় কথা বলছে। Globalization যুগের প্রভাবে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য গুলোকে অবহেলা করে পশ্চিমের নাটকের কায়দাকে আপন করা হচ্ছে। লোকায়েত গল্প, কথ্য ভাষায় প্রয়োগ, লোকগান আস্তে আস্তে পিছু হটছে। লোক - সংস্কৃতির এই ধারাকে কতদিন বাঁচিয়ে রাখা যায় সেটা একটা বড়ো প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
কেরালার আধুনিক থিয়েটার বেশ জনপ্রিয় নাটককে ঘিরে সেখানে জন-আন্দোলন অবধি হয়েছে। শ্রী চান্দু মেননের লেখা 'ইন্দুলেখা' দেখে দর্শকরা ইন্দুলেখার কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে। মহম্মদ বশীরের গল্পের নাটক দর্শকদের লজ্জিত করেছে। আমি নিজে 'সরস্বতী-বিজয়ম' দেখতে দেখতে অপরাধবোধে ভুগেছিলাম বেশ কিছুদিন। আধুনিক নাটক নিয়ে experiment করা যেতেই পারে, প্রাচীন ভঙ্গুর থাইয়ামকে নিয়ে করার খুব দরকার আছে কি?
ত্রিশুর শহর থেকে একটু দুরে গড়ে উঠেছে কেরালা কলা মওলম। এখানে নাচ - গান - নাটক নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করার ব্যবস্থা আছে। শ্রী ভাল্লাথল নারায়ণ মেননের স্বপ্নে গড়া এই মওলম থাইয়ামের দ্রুত পরিবর্তিত রূপটির বিশ্লেষণ করেছে। কিছু সদার্থক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। আশা করা যায় এর প্রভাব ভবিষ্যতে দেখা যাবে। থাইয়ামের মৃত্যু হাজার বছরের পুরোনো নাট্যকলার মৃত্যু, লোকনাটকের মৃত্যু, অকুলীন কৌম সমাজের মৃত্যু। থাইয়ামের কথা ভাবলেই যেন ধূসর অতীতের বুক থেকে ভেসে আসে তথাকথিত নীচু জাতদের মন্দিরের নাটক দেখার জন্য প্রার্থনা, ব্রাহ্মণদের গর্জন, জঙ্গলের ভিতরে নিজেদের মতো করে মহলার আওয়াজ, লোকগান আর লোকনৃত্যর সুর আর কালজয়ী লোকায়েত গল্পের শব্দমালা। তাই থাইয়ামকে বাঁচাতে হবে - নাটকের স্বার্থে শুধু নয় মানবতার স্বার্থে ।
(বিশেষ সহযোগিতায় : তুষার ভট্টাচার্য)
সুলগ্না চক্রবর্তী
চন্দননগর নিবাসী
বর্তমানে বিশাখাপতনমের DAV স্কুলে কর্মরতা ।
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে National Scholarship ( UGC) নিয়ে ভূগোলে মাষ্টার করেছেন।
বাঙলা , হিন্দি ও ইংরেজি ভাষাতে লেখেন এবং তেলুগুতে কিছু লেখা অনুবাদ হয়েছে। INTACH , ABP , AIR , CBT , NBT ইত্যাদিতে বহুবার লেখা বেরিয়েছে। শিশু সাহিত্য , কিশোর - প্রবন্ধ ও ছোটদের নাটকের ওপর কাজ করে স্বীকৃতি এসেছে কেন্দ্র সরকারের মানব সম্পদ উন্নয়ন পর্ষদ থেকেও।
এখন প্রাচীন যুগের নাটক নিয়ে পড়াশোনা করছেন এই লেখিকা।






2 Comments