পুঁজিবাদ নিজেই একটি ভাইরাস / শ্রমজীবী মানুষ পৃথিবী বদলানোর শপথ নেবে


করোনা-উত্তর পৃথিবীঃ স্বপ্নসমীক্ষা


জিন্না আহমেদ

নাট্যকর্মী, বোলপুর আমরা সবুজ

অনেকেই ভাবছেন, করোনার করালগ্রাস থেকে কোনরকমে মুক্তি পেলে পৃথিবীতে যে নতুন সূর্যোদয় হবে, সেখানে প্রতিটি রাষ্ট্র আরো অনেক বেশি মানবিক হয়ে উঠবে। পুঁজিবাদের গায়ে লাগবে অভিনব মানবিক মলাট। আমি তা বিশ্বাস করি না। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের আদৌ কোন সংশোধন সম্ভব কিনা তা আমাদের ভাবতে  হবে। প্রথমেই দেখতে হবে পুঁজিবাদের মূল ভিত্তিটা কী? পুঁজিবাদের মূল জীবনীশক্তি মুনাফা আর জীবনীক্ষেত্র হলো বাজার। এ দু’টির কোনটি থেকে পুঁজিবাদ নিজেকে উইথড্র করলে তা হবে মৃত-পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ নিশ্চয়ই স্বেচ্ছায় আত্মঘাতী পথে এগোবে না। অনেকে বলবেন, মুনাফানীতি থেকে পুঁজিবাদ নিশ্চয়ই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, এতদিন তা করে নি কেন? করোনা বিপর্যয় কি আকস্মিক কোন ঘটনা? নাকি অনেক আগে থেকেই সতর্কবাণী ঘোষিত হয়েছিল? আমরা জানি ২০০৯ সালের  বিশ্ব স্বাস্থ্যসংথার সাথে যুক্ত বৈজ্ঞানিকদের একটি রিপোর্টেই এই অতি সংক্রমণশীল ভাইরাসের পূর্বাভাস ছিল। তবু পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি এই সংক্রান্ত গবেষণায় খরচ না বাড়িয়ে প্রতিরক্ষার নামে যুদ্ধাস্ত্র কেনায় খরচ বাড়িয়ে ছিল। প্রায় সমস্ত রাষ্ট্রেই অবহেলিত থেকেই জনস্বাস্থ্যের মত অতীব প্রয়োজনীয় ও সংবেদনশীল বিষয়গুলি। 

পুঁজিবাদ থাকবে অথচ মুনাফা থাকবেনা, প্রতিযোগিতা থাকবে না, যুদ্ধ থাকবে না, সাম্রাজ্যবাদী প্রবণতা থাকবে না,  তা উদ্ভট কল্পনাবিলাসীদের পক্ষেও কল্পনা করা সম্ভব নয়। জাদুছড়ির পিছনেও তো যুক্তি থাকে। একটি বিষয় খেয়াল করে দেখুন, আমরা বিশ্বাস করি বা না করি, প্রথমে আমেরিকা বলেছিলো- এটা চিনের চক্রান্ত! তারা এই ভাইরাসের নাম দিয়েছিল ‘চিনা-ভাইরাস’। উল্টোদিকে চিন বললো, ‘ মার্কিন সেনারা চিনে যৌথ মহড়া দিতে এসে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে। পারস্পরিক এই অভিযোগ থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার যে, পুঁজিবাদী রাষ্ট্ররা জানে প্রয়োজনে তারা জীবানুকে মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, নইলে অভিযোগ উঠবে কেন? আসলে কী ঘটেছে আমরা জানি না। তবে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির উপর কোন আস্থা রাখার আর বিন্দুমাত্র কারণ নেই।

এই জীবানুযুদ্ধের প্রসঙ্গটি বাদ দিলেও অন্য যে প্রসঙ্গটি আপনি কোনভাবেই এড়িয়ে যেতে পারবেন না তা হলো, প্রজাতি ও প্রকৃতির বাস্তুতান্ত্রিক সম্পর্ককে সম্পূর্ণ বিনষ্ট করেছে পুঁজিবাদ। ক্রমবর্ধমান মুনাফা  আত্মীকরণের জন্য পৃথিবীজোড়া কর্পোরেট কোম্পানীগুলি বিস্তৃত বনভূমি বিনষ্ট ক’রে পুঁজি-পরিকাঠামো সম্প্রসারণে অন্ত্যেবাসী মানুষকে আরো প্রান্তিক করেছে। শিল্প-সভ্যতার দাপটে অরণ্য ধ্বংস হয়েছে, সমুদ্র বিষাক্ত হয়েছে, মেরু-অঞ্চলের বরফ গলেছে। প্রাগৈতিহাসিক ভাইরাসের পুণরুজ্জীবনের ক্ষেত্র প্রস্তুত  করেছে পুঁজিবাদ। তাই যেদিকেই তাকান, আজ প্রজাতিগত অস্তিত্বের বিপন্নতার সাধারণ অনুঘটক একটি, তা  হলো – ‘পুঁজিবাদ’। জানি, ‘পুঁজিবাদ’ শব্দটিকে বড় রাজনীতি আশ্রিত শব্দ বলে মনে হচ্ছে। তা হোক, তবু ‘পুঁজিবাদ’কে আমাদের বুঝতেই হবে। এই ব্যবস্থার প্রতি বিন্দুমাত্র আস্থা রাখা মানেই আত্মহননের পথকেই প্রশস্থ করা।

আসলে করোনা-উত্তর পৃথিবী আরো ভয়াবহ অভিজ্ঞতাকেই আমাদের সামনে নিয়ে আসছে। পৃথিবীজুড়ে কোটি কোটি মানুষ কাজ হারাবে। অনতিক্রমনীয় অর্থনৈতিক সংকটে ধুকতে থাকা রাষ্ট্রগুলি তার মানবিক মুখোশগুলি সম্পূর্ণ গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হবে। জনরোষ সামলাতে রাষ্ট্রগুলি জাতিদাঙ্গা,সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পথকে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেবে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যদাঙ্গা শুরু হবে প্রকাশ্য রাজপথে। লুট-ছিনতাই-হত্যা-প্রতিহত্যায় বিধ্বস্ত হবে ধরণী। করোনাতে যত লোক মারা যাবে, তার কয়েকগুণ বেশি লোক মারা যাবে করোনা-উত্তর পৃথিবীতে। হ্যাঁ, এ সমস্তই প্রিডিকসান। তবে পাশাপাশি এ প্রিডিকশনও রাখছি যে, পৃথিবী   এসে দাঁড়াবে একটি মাত্র বিকল্পের সামনে – ‘গণবিপর্যয় অথবা গণ-অভ্যুত্থান’ ! শ্রমজীবী মানুষ পৃথিবী বদলানোর শপথ নেবে। পুঁজিবাদের খপ্পর থেকে ধরিত্রীকে ছিনিয়ে এনে মানবিক ছায়ায় সুশীতল করবে।   কিন্তু এ কাজ সহজ নয়।

আমার মনে হয়, পুঁজিবাদ নিজেই একটি ভাইরাস। একে নিঃশেষ করা সহজ নয়। মুমূর্ষু পুঁজিবাদও উপযুক্ত পরিবেশ পেলে আবার সজীব হয়ে উঠবে। আমরা সাধারণ মানুষেরা নিজেদের অজান্তেই পুঁজিবাদের ভাবাদর্শ লালন করি। বাংলাদেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী প্রয়াত অভিজিৎ রায় জানিয়েছিলেন, ল্যাঙ্গটাস ফ্লুক বলে একটি ভাইরাস আছে, যা পিঁপড়ের মাথায় বাসা বাঁধে, এই ভাইরাসের প্রভাবে পিঁপড়েটি কোন একটি লম্বা ঘাসের পাতা বেয়ে উপরে ওঠে আবার টুপ করে নীচে মাটিতে পড়ে যায়, এই কাজটা সে ক্রমাগত করে যেতে থাকে। এই একঘেয়েমি কাজটাতে পিঁপড়ের কোন উপযোগিতা নেই, তবে সেটা পিঁপড়ের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়। তৃণভোজী পশুরা যখন এই ঘাস চিবিয়ে খায়, তখন ঘাসের সাথে পিঁপড়ে এবং পিঁপড়ের সাথে ভাইরাস তৃণভোজীদের পেটে চলে যায়। জানা গেছে একমাত্র তৃণভোজীদের পাকস্থলীতেই ঐ ভাইরাস তার বংশবৃদ্ধি ঘটাতে পারে। নিজের বংশবৃদ্ধির স্বার্থে পিঁপড়ের  মধ্যে এক অনায়াস অভ্যস্থতার দর্শন তৈরি করেছিল  ল্যাঙ্গটাস ফ্লুক নামের ভাইরাসটি। আমার মনে হয়  এই  উদাহরণটিই যথেষ্ট, আমরা কিভাবে পুঁজির সম্প্রসারণের জন্য আত্মাহূতি দিচ্ছি।


পুঁজিবাদ নিজেই একটি ভয়ঙ্কর ভাইরাস। সুতরাং কিভাবে এই ভাইরাস মোকাবিলা করা যাবে তা আমাদের অধ্যয়ণ করতে হবে। ভাইরাস প্রতিরোধে অনেকে হার্ড-ইমিউনিটির কথা বলছেন। এই হার্ড-ইমিউনিটি হলো একটি সামষ্টিক প্রতিরোধ। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রচেতনার বিপরীতে আছে মুনাফাহীন সমাজচেতনা। এই সমাজচেতনার সম্প্রসারণই প্রাথমিকভাবে  ভাইরাস নিঃশেষীকরণের ভ্যাকসিন হিসেবে কাজ করতে পারে। প্রস্তুতি সমাসন্ন। পৃথিবীর শ্রমজীবী আর ভাইরাস-ভোক্ষ হবে না।




---- সমাপ্ত ----



Post a Comment

0 Comments