জলপাইগুড়ি কলাকুশলী নাট্যোৎসব ২০১৯



 নাট্যমেব মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত

১১ জানুয়ারি থেকে ১৩ই জানুয়ারি জলপাইগুড়ি রবীন্দ্রভবনে হয়ে গেল জলপাইগুড়ি কলাকুশলী আয়োজিত নাট্যোৎসব ২০১৯। প্রথম দিন প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে উৎসব এর সূচনা করেন সংস্থার সভাপতি রত্না সেন রায় এবং ঢাকা বটতলা নাট্যদলের নির্দেশক বিশিষ্ঠ নাট্যব্যক্তিত্ব মহম্মদ আলী হায়দার। এর পর মঞ্চস্থ হয় তাঁদের বিখ্যাত প্রযোজনা 'খনা'। নাচ, গান, অভিনয়, আবহ ও অসামান্য টিমওয়ার্ক মুগ্ধ করেছে দর্শক শ্রোতাকে। খনার নানা আখ্যান কে জুড়ে গবেষণাধর্মী এই নাটক একদিকে যেমন পুরুষ তান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠিত করে প্রাকৃত জনের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান এবং বিজ্ঞান তখনই সার্থক, যখন তা গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষের উপকারে ব্যবহৃত হয়। দ্বিতীয় দিনের প্রথম নাটক শিলিগুড়ি সৃজন সেনার একটি রাজনৈতিক এবসার্ড 'ভাঙা ডানা ফিনিক্স পাখি'‌। পার্থ প্রতিম মিত্র রচিত নির্দেশিত এ নাটকে বিধৃত হয়েছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাফল্য ব্যর্থতার দীর্ঘ ইতিহাস। তত্ত্ব, আলোচনার চার দেওয়ালে আটকে থাকা বামপন্থীরা যেন বিপ্লবের পথ নির্দেশ পান মহারাষ্ট্রের কৃষকদের লং মার্চ–এ। এই দিনের দ্বিতীয় নাটক আরেকটি রাজনৈতিক স্যাটায়ার বহরমপুর রঙ্গভূমি অভিনীত 'জানালা'। দারিও ফো'র দুনিয়া কাঁপানো নাটক অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ অব অ্যান অ্যানারকিস্ট অবলম্বনে রাজেন দাস রচিত নির্দেশিত নাটক কমেডির মোড়কে প্রশাসনিক ও পুলিশি ব্যবস্থার তুলোধনা করেছে এ সময়ের প্রেক্ষিতে। রাষ্ট্র কী ভাবে পুলিশকে ব্যবহার করে প্রতিবাদী কণ্ঠ কে রোধ করতে চায় তাই হাসির আড়ালে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে এ নাটক। অসামান্য অভিনয়, আলোক পরিকল্পনা দিয়ে মাতিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে বর্ষীয়ান অভিনেতা গৌতম মজুমদার তার অভিনয়ের জাদুতে সম্মোহিত করে রেখেছিলেন। 

   তৃতীয় দিনে উৎসব এর শেষ নাটক ছিলো মালদা মালঞ্চের 'আলকাপ মায়া'। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের মর্মস্পর্শী উপন্যাস 'মায়া মৃদঙ্গে'র মঞ্চ রূপ এ নাটকে দৃশ্যায়িত হয়েছে এক আলকাপ শিল্পীরা সম্পর্কের সঙ্কট, সেই সাথে শিল্পের সঙ্কট ও। চটুল গান, নাচ বিনোদন গ্রাস করছে এ শিল্পকে। অন্যদিকে পুরুষের নারী সেজে অভিনয়, এক অন্য মায়ায় আচ্ছন্ন করে শিল্পীকে। যার জন্য বিসর্জন দিতে হয় তাঁর পরিবার সংসার। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্পী তবুও আলকাপকে নিয়েই বেঁচে থাকতে চান এবং পৌঁছে দিতে চান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। পরিমল ত্রিবেদীর রচনা, নির্দেশনায় এ নাটক দলগত অভিনয়ের আর আলোক পরিকল্পনার নৈপুণ্যে ছুঁয়ে গেছে দর্শক হৃদয়। তবে গানের নাটকে সুরের কিছু চ্যুতি রসভঙ্গ ঘটিয়েছে। তবে প্রত্যেক দিনই প্রায় পুরনো প্রেক্ষাগৃহ এ শহরের নাট্য প্রেমের পরিচায়ক। ভিন্ন স্বাদের নাটক পরিবেশন করে কলাকুশলী জিতে নিয়েছে রসিক জনের হৃদয়, তা বলাই বাহুল্য।

Post a Comment

0 Comments