আমরা সবুজ
'আমরা সবুজ' পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের সর্বজন–পরিচিত একটি নাট্য সংস্থা। অজস্র প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিগত পনের বছর ধরে এই নাট্য সংস্থা নিরন্তর নাট্যচর্চায় নিয়োজিত থেকে জেলার নাট্যচর্চার ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোজনা করেছে। নাট্য–শিল্পকে একটি অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে আজকের নয়াপ্রজন্মের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সংবেদনশীলতা, যুথবদ্ধতাও সামাজিক চেতনাকে সম্প্রসারণ করা অঙ্গীকারে আমরা সবুজ দায়বদ্ধ। বস্তুত সেই জন্যই শিশুকিশোরদের মধ্যে নাট্যচেতনা বিকাশে লক্ষ্যে 'আমরা সবুজ' গড়ে তুলেছে একটি স্বতন্ত্র বিভাগ। বিদ্যালয়ের ছাত্র ও বিদ্যালয় বহির্ভূত পথ–শিশুদের নিয়ে 'আমরা সবুজ' বছরের বিভিন্ন সময়ে নাট্য–কর্মশালা শিবির আয়োজন করে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে। দায়বদ্ধ নাট্য–আন্দোলনের ধারাকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে 'আমরা সবুজের' বড়দের বিভাগ তাদের সাম্প্রতিক প্রযোজনাগুলির মধ্য দিয়ে দর্শকসমাজে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাদের উল্লেখযোগ্য প্রযোজনাগুলি হল 'শাড়ি', 'রিরংসা', 'থাকে শুধু অন্ধকার', 'রাস্তা কারোর একার নয়', 'ওহি ফালতু কিস্যা', 'নক্সী কাঁথার মাঠ' ইত্যাদি। আমরা সবুজ নাট্যদল নাট্যাভিনেত্রী পূর্ণিমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিতে শান্তিনিকতনের সোনাঝুরিতে গড়ে তুলেছে 'নিভৃত পূর্ণিমা নাট্যগ্রাম'। কবিগুরুর স্পর্শধন্য শান্তিনিকতনের অরণ্যময় নিসর্গের স্নেহস্নিগ্ধ কোলেই নির্মিত এই নাট্যগ্রামে গড়ে উঠেছে বহিরঙ্গনের নাট্যচর্চার বিকল্প পরিকাঠামো। অন্তরঙ্গ নাট্যোপস্থাপনার জন্য এখানে রয়েছে অনন্যসুন্দর গোলবাড়ি–'নাট্যশালা'। এখানে প্রতি রবিবার সন্ধ্যায় প্রদর্শিত হয় পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত নাট্যদলের নাটক। অকৃত্রিম আদিবাসী সংস্কৃতির সাথে নাগরিক সংস্কৃতির অভিস্রবণের উৎসমুখটি খুলে দিয়েছে এই নাট্যগ্রাম। এই নাট্যগ্রামে রয়েছে অবারিত শ্যামলসুন্দর তরুসমারোহিত প্রান্তর যা থিয়েটার সহ অন্যান্য সৃজন–শিল্পের কর্মশালার উপযোগী এক অনন্য সাধনাক্ষেত্র।
রানাঘাট সৃজক
চলা শুরু ২০০০ সনে। ২৬টি ইট ভাটার শ্রমিকদের শিশু কিশোরদের সঙ্গে নিয়ে। তবে প্রথম অবস্থায় সৃজকের নাম সৃজক ছিল না। তারা তাদের পাড়া বিন পাড়ার ক্লাব অভিযান সংঘের নামে নাটক করতেন। তবে ক্লাবে সম্পূর্ণ অসহযোগিতার জন্য ২০০৭ সালে তাদের নাম হয় রানাঘাট সৃজক। মূলত তারা ছোটদের নাটক করতেন তাদের প্রথম নাটক অমল দালালের ছোটদের নাটক 'হুক্কা পেল সাজা' ও নিরুপম ভট্টাচার্য্যের নাটক 'আমরা শিশু'। এই নাটক প্রথম মঞ্চস্থ হয় রানাঘাট রবীন্দ্র ভবনে। সময় ২০০০ সালের ৮ ই আগস্ট। এর পর তারা কিছু দিন চুপ থাকে। আবার পুনরায় কাজ শুরু হয় ২০০৩ সুকুমার রায়ের ২১ শে আইন কবিতা অবলম্বনে নাটক '২১ শে আইন'। তারা এই নাটকটি ৫০টি অভিনয় অতিক্রান্ত করে। এই নাটকটি মূলত তারা প্রতি শনি ও রবিবার তাদের পরিচিত বিভিন্ন ক্লাবে অভিনয় করে এবং গামছা পেতে ১৫ হাজার টাকা জোগাড় করে ২০০৪ সাল নাগাদ প্রায় ২০জনকে ঐ অর্থে স্কুলে ভর্তি করেন। নাট্য উৎসব ও শুরু হয় ২০০৪ সালেই। তারা এই সময় শোয়ারাব হোসেনের গল্প অকাল যাযাবর নিয়ে প্রথম বড়োদের নাটক করে, নাটক আকাল যাযাবর। এরপর ছোটদের নাটক দুষ্টু ছেলে, রূপকথার কেলেঙ্কারী, ভীতুভূতের গল্প, বন্ধু হও, বিলের ছেলেবেলা, বাঘের গান প্রভৃতি। বড়োদের নাটক আমি মদন বলছি, অভয়ারন্য, পূর্বজন্মের ভাই, হারুন অল রসিদ, অন্ত্যেষ্টি, চৌর্যগাথা, ম্যানমেড, জলই জীবন, ছি, বসন্ত এসে গেছে, নয়ন কবিরের পালা, প্রভৃতি।
বর্তমানে রানাঘাট সৃজকের নিজের ঘর তৈরি হয়েছে। শুধু থিয়েটার চর্চার জন্য। তারা ২০১২ সাল থেকে গোপাল মল্লিক স্মারক স্মৃতি প্রদান করতে পেরেছেন আটজন রানাঘাটের প্রবাদ প্রতিম নাট্য অভিনেতা ও সংগঠকদের। এছাড়া তারা প্রতিমাসের প্রথম রবিবার থিয়েটারের আড্ডা শুরু করেছেন। ত্রিশ জন এই আড্ডায় নিয়মিত আসছেন। একটি বিশেষ কথা থিয়েটার করে একসঙ্গে কি করে বাঁচা যায় তার চেষ্টা রানাঘাট সৃজক করছে। একটা উদাহরণ দিলেই বোঝাযাবে তারা শো করবার পর যতটুকু অর্থ অর্জন করেছে কখন গামছা পেতে কখন হাত পেতে তারা সবসময় চেষ্টা করে সবাই যেন সমান অর্থ পায়। আর একটা বিষয় হল তাদের নির্দিষ্ট কোন পরিচালক নেই। তারা সবার মতামত নিয়েই নাটক নির্মাণ করেন। তাই তাদের পরিচালক হীন একটা দল বলা চলে। তাদের বর্তমানে রবিবার করে ছোটদের মহলা হয় আর বড়োদের মঙ্গলবার আর বৃহস্পতিবার মহলা হয়। ছোটদের সংখ্যা প্রায় ৬০ আর বড়রা প্রায় ২০ জন।
অবশ্য সব ছোট বা বড় নিয়মিত তাদের সঙ্গে অভিনয় করেন না। তারা তাদের ভালোবাসেন আবদার মেটান।







0 Comments