সৌমিত্র বসু
শম্ভু মিত্র বেশ কিছু নাটক লিখেছেন, তাদের মধ্যে অন্তত একটি, চাঁদ বণিকের পালাকে তো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সেরা নাটক হিসাবে গণ্য করা হয়। অনেকগুলি প্রবন্ধ আছে, গোনাগুনতি কয়েকটি ছোটগল্প। কিন্তু সকলেই নিশ্চই মানবেন যে মানুষটির আসল পরিচয় লেখক হিসাবে নয়, নির্দেশক এবং অভিনেতা হিসেবে। সেলিম আল দীনের কথা মনে রেখে বলা যেতে পারে, একটা সময়ে নাট্যাভিনয় ছিল মৌখিক সাহিত্যের উপস্থাপনা–নির্ভর রূপ, কিন্তু আধুনিক কালে তার ভাষা–সাহিত্যের ভাষার থেকে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেছে। সাহিত্যের সৃজন মানুষের উচ্ছারণযোগ্য ভাষা নিয়ে, নাট্য তার সঙ্গে আরো অনেকগুলি উপাদানকে যুক্ত করে। সমস্যা হল, সাহিত্য কেমন করে ব্যঞ্জনা তৈরি করে তা ব্যাখ্যা করার একাধিক তরিকা তৈরি হয়ে গেছে, কিন্তু নাট্য প্রযোজনা আর অভিনয় কীভাবে তার উপভোক্তার মনে রসের জন্ম দেয় তা বর্ণনা করার উপায় এখনো পর্যন্ত ঠিক ঠিক পাওয়া গেছে এমনটা নয়। এই লেখায় আমি এমন কয়েকটি নত্যমুহূর্তের বর্ণনা দেবার চেষ্টা করব, দেখবার চেষ্টা করব কেমন করে সেই মুহূর্তগুলি নির্মাণের মধ্যে দিয়ে শম্ভু মিত্রের প্রযোজনা তাঁর মনের কথাগুলিকে প্রকাশ করতে পারছে।
তার আগে বলা দরকার, খুব স্বাভাবিক কারণেই শম্ভু মিত্রের সব প্রযোজনা বা অভিনয় দেখবার সুযোগ হয় নি। বস্তুত, আমার জন্মের মধ্যেই তাঁর করা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ মঞ্চের আলো দেখে ফেলেছে। যখন নাটক দেখার বয়সে পৌঁছেছি তার আগেই তিনি বন্ধ করে দিয়েছেন নতুন নাটকের প্রযোজনা করা। পুরনো প্রযোজনাগুলি পরে অভিনয় করেছেন মাঝে মাঝে, তাদের মহড়া এবং অভিনয় দেখবার সুযোগ ঘটেছে, কখনো হয়তো তাই নিয়ে দুটো কথা বলবার সৌভাগ্যও পেয়েছি। চাঁদ বণিকের পালার মহড়া দিতে শুরু করেন তিনি সাতের দশকের মাঝামাঝি থেকে, সেখানে আমার ভাগ্যে জুটেছিল লখীন্দরের পার্ট, তার বেশ কিছু স্মৃতি মনের মধ্যে অক্ষয় হয়ে আছে। তার বাইরে বহুরূপীর বড়দের মুখে অনেক কথা শুনেছি, তারাও চলে আসতে পারবে আলোচনার মধ্যে। এই সব নিয়েই এই লেখা, শম্ভু মিত্রের নাট্যভাষা—এ তার নাট্যভাষার সম্পূর্ণ মূল্যায়ণ নয়।
তার আগে দু–একটা তত্ত্বকথা বলে নেওয়া দরকার। ভাষা বলতে বুঝি যা দিয়ে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করে। তা যে শুধুই মানুষের উচ্চরণযোগ্য শব্দ দিয়েই হতে হবে তার কোনো মানে নেই। পশুও শব্দ করে তার মনের ভাব প্রকাশ করে, তাকে তার ভাষা মনে করতে বাধা নেই। তার বাইরেও, আকার ইঙ্গিত, এমন কি নৈঃশব্দ দিয়েও মনের ভাব অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় তা আমরা সকলেই জানি। মুখের ভাষা যা নিয়ে মুখ্যত ভাষাবিজ্ঞানীদের কাজ, নাট্যভাষা তার আওতা ছাড়িয়ে আরো বহুদূর প্রসারিত হতে পারে। নাট্য, আমরা জানি, চোখ দিয়ে দেখতে হয় এবং শুনতে হয় কান দিয়ে। কিন্তু ভাবলে দেখা যাবে, শুধু চোখ আর কান নয়, অর্থবহ যা কিছু আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়ে প্রবেশ করতে পারে তার সবটাই ভাষার অন্তর্গত। শম্ভু মিত্রের কাজ থেকে তার উদাহরণ দেওয়া যাবে তার আগে বলে নিতে চাই, আওয়াজ দিয়ে তৈরি করা এক একটি শব্দের যে আমরা এক একটি অর্থ ধরে নিয়ে থাকি, তার পেছনে কোনো অনিবার্য যুক্তি নেই। কাগজ বললে যা বুঝি তার নাম অন্য কিছুও হতে পারত, কলম বললে যে ছবি ভেসে ওঠে সে ছবির বদলে জানলার ছবি মনের মধ্যে যে জেগে ওঠে না তার একমাত্র কারণ শব্দগুলির ওই অর্থ আমাদের ছোটবেলা থেকে শেখানো হয়েছে, এখন তারা আমাদের সংস্কারের অন্তর্গত হয়ে গেছে। যখন কোনো লেখায় সেই শব্দ বা শব্দগুলি পড়ি, অথবা কারুর মুখে শুনি, তখন সেই শব্দের ব্যঙ্গার্থ আমরা নিজের নিজের বুদ্ধি বিবেচনামত বার করবার চেষ্টা করি বাক্য বা গোটা রচনার তাৎপর্যের ভিত্তিতে। তাই, বাক্যটি এক হওয়া সত্ত্বেও, দুজন সম্পন্ন সুখী বন্ধুর মধ্যে কথা হবার সময় একজনের মুখে আমি ভাল আছি বাক্যটি যে মানে প্রকাশ করে, ধরা যাক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া স্বামী–স্ত্রী, এই বিচ্ছেদ যাদের অন্তত একজনের জীবনকে ধবংস করে দিয়েছে, তার মুখে ওই একই বাক্য অন্য অর্থ তৈরি করে।
এই নিয়ে সাহিত্যের কাজ, এই নিয়ে নাট্যেরও কাজ। শুধু উচ্চারিত শব্দ দিয়ে নয়, নাট্য আরো নানা শব্দ দিয়ে অর্থ তৈরি করতে পারে, তৈরি করতে পারে নানা দৃশ্য দিয়েও। শম্ভু মিত্রের প্রযোজনা থেকে একটা উদাহরণ দিই। ইবসেনের অা ডলস হাউস নাটকের বাংলা রূপান্তর পুতুল খেলায় দুটি চরিত্রের কথা হচ্ছে, ডাক্তার রায় আর বুলু। ডাক্তারের পূর্বপুরুষের নানা ব্যাভিচারের ফল হিসেবে তাঁর শরীরে মারাত্মক অসুখ বাসা বেঁধেছে, নিজে ডাক্তার বলে তিনি তাঁর আশু মৃত্যু বিষয়ে নিশ্চিত। তিনি মনে মনে বুলুকে ভালবাসেন, বুলু তপনের স্ত্রী, আপাতদৃষ্টিতে খুবই সুখী দাম্পত্য তাদের। দৃশ্যটি হল, ঘরের মধ্যে ডাক্তার আর বুলু, মেঘলা বিকেল। একটা বড় রকমের সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে বুলুবেশী তৃপ্তী মিত্র বললেন, ডাক্তার রায় আপনি তো জানেন ও আমার জন্যে প্রাণ পর্যন্ত দিতে পারে। ডাক্তার একটু খাদের গলায় কিছুটা গাঢ় স্বরে বলেন ও কেবল একলাই তা পারে? বুলু একলাই– বলে থমকে যায়, যেন বুঝতে পারে কোনো একটা অকথিত সংলাপ ডাক্তারের কথার মধ্যে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে। ডাক্তার বলেন, হ্যাঁ, ও কেবল একলাই তোমার জন্যে সব কিছু করতে পারে বল? একটু থেমে বুলু। তারপর অন্যরকম চড়া গলায় মিসেস চ্যাটার্জী! আমি ঠিক করেছিলাম একেবারে চলে যাবার আগে এই কথাগুলো আপনাকে জানিয়ে দিয়ে যাব। এখন তো আপনি সব জানতে পারলেন, এখন কি আপনি আমাকে বিশ্বাস করে সবকথা বলতে পারেন না? বুলু ব্যথিত কণ্ঠে বলে, এই কথাগুলো আপনি কেন বললেন ডক্টর রায়। আমরা কী রকম বন্ধু ছিলাম। ততক্ষনে মেঘলা বিকেল সন্ধ্যের দিকে ঢলে পড়ছে, ঘর আবছা হয়ে এসেছে। বুলু হটাৎ ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিয়ে বলে–এখন আপনার একটু একটু লজ্জা করছে না?
অনেক দিন আগের দেখা, সংলাপের কিছুটা এদিক ওদিক হতে পারে। ছাপা বইয়ের সাহায্য নিয়ে লাভ নেই, অভিনেতা সব সময়েই যে হুবহু সংলাপ বলবেন তা নাও হতে পারে। কিন্তু এই যে দুজন মানুষের মনের গহন স্তরকে উন্মোচিত করার মুহূর্ত, তার সঙ্গে শম্ভু মিত্র একটি মেঘলা, নিবিড় বিকেলকে পশ্চাৎপটে রাখলেন, মুহূর্তটির ব্যঞ্জনা আরো গভীর হয়ে উঠল। পুতুল খেলাতেই শম্ভু মিত্রের করা এমন বাঙময় দৃশ্যের কথা আরো মনে পড়ে। বিজয়া সম্মিলনীর সন্ধ্যেবেলা তপন আর বুলুর ঘরে আসেন ডাক্তার রায়। সেদিন তিনি নিশ্চিত হয়ে গেছেন নিজের মৃত্যু সম্পর্কে। তপনের কাছে সিগারেট চান, যা তিনি কখনো খান না। বুলু আসে সিগারেট ধরিয়ে দিতে। মুখে সদ্য আগুন লাগানো সিগারেট, তার আভা অল্প পড়েছে মুখের ওপর, ডাক্তাররূপী কুমার রায় বললেন, ধন্যবাদ। আগুনটা জ্বালিয়ে দিলেন বলে ধন্যবাদ। নমস্কার... নমস্কার বলতে বলতে চলে যেতেন। আগুন শব্দের যে নানা স্তরের মানে তৈরি হত ওই সংলাপটিকে ঘিরে, তার পেছনে তৃপ্তি মিত্রের ওই জ্বলন্ত দেশলাই নিয়ে হাত বাড়িয়ে রাখার একটা ভূমিকা তো থাকতই। এই প্রসঙ্গে খালেদ চৌধুরীর করা মঞ্চনির্মান প্রসঙ্গেও বলতে হবে। বলা বাহুল্য শম্ভু মিত্র অনুমোদন করেছিলেন বলেই তাঁর পক্ষে এমন মঞ্চপরিকল্পনা করা সম্ভব হয়েছিল। নাট্যের প্রথমার্ধে, হাসিখুশি বুলু প্রচুর বাজার করে ঘরে আসে। সুখী একটি জীবন তাদের, খালেদ চৌধুরী বেডকভার বা জানলার পর্দার রঙ করেছিলেন ঝকঝকে, উজ্জ্বল। দ্বিতীয়ার্ধে ঘটনা যখন সংকটের দিকে বাঁক নিয়েছে, তখন তাদের রঙ হয়ে যায় খানিকটা দমচাপা, গায়ে আঁকা থাকে জালের আঁকিবুঁকি। কোথাও দর্শকের মনের মধ্যে এই রঙের বিষণ্ণতা ছায়া ফেলতে থাকে, ওই জালের অলঙ্কারণ যেন বুলুকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরতে চায়।
চার অধ্যায়ের নাট্যরূপ করেছিলেন বহুরূপী, শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায়। তার দ্বিতীয় দৃশ্য এলার ঘর। সেখানে অন্তু আর এলা বসে আছে। পেছনে গেরুয়া রঙের একটি আকাশী পট, ইন্দ্রনাথের কাছে এলা কথা দিয়েছিল, সে আজীবন কুমারী থাকবে। একটি নিচু সোফায় বসতেন তৃপ্তি মিত্র, শম্ভু মিত্রের অতীন বসতেন তার পায়ের কাছে। নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে বলতে উঠে পড়ে মোকামা ঘাটের স্মৃতি, অতীন আবৃত্তি করে— প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস/ তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ। সেই মুহূর্ত থেকে চরিত্রদের মুখের ওপর থেকে আলো মুছে যায়, সূর্যাস্তের আলোর রঙে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে পেছনে গেরুয়া কাপড়। এলার ঘর মুহূর্তের মধ্যে একটা অনন্তের বিস্তৃতি পায় আলোর সামান্য কারিকুরিতে। এই দৃশ্যের শেষে, হটাৎ চিঠি পেয়ে ঘর থেকে চলে যায় অতীন, এলা তখন ভেতরের ঘরে গেছে। ফাঁকা মঞ্চে প্রবেশ করে এলা, তার অন্তুকে ডাকতে থাকে, আলো ম্লান হয়ে যায়। শুধু মঞ্চের এককোনে রাখা বুক কেসের ওপরে রাখা একটি কালীর ছবি থাকত, জবাফুল দিয়ে ঢাকা, সব আলো নিভে গিয়ে সেই জবাফুলের আবডাল থেকে একটু আলো পড়ে দেবীর মুখে, নিচে থেকে পড়া আলোয় সে মুখ ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তখন মনে পড়ে, নাটকের সূচনায়, তৃতীয় ঘণ্টা বাজবার পরে ঘোর অন্ধকারে শোনা গিয়েছিল এক স্তোত্র, ব্যাঘ্রচর্ম পরিহিতা, শুষ্ক মাংসে অতি ভয়ঙ্কর, রক্তনয়না হুংকারে চতুর্দিক প্রকম্পিত করা এক দেবীর বর্ণনা। এও মনে পড়ে, আমাদের হিংসাশ্রয়ী স্বদেশীদের পূজ্য ছিলেন দেবী কালী, চার অধ্যায় উপন্যাসে নেই, কিন্তু প্রযোজনায় সেই কালীর রূপকে নানাভাবে আভাসিত করে তোলা হয়েছে। আর একটি ছবির কথা বিশেষ করে মনে পড়ে। চার অধ্যায় নাটকের এ হল শেষ দৃশ্য। দৃশ্যটি ঘটছিল এলার বাড়ির ছাদে। বাড়িতে তখন কেউ নেই, রাত তখন প্রায় এগারোটা।
মঞ্চ প্রায় ফাঁকা থাকত, যেমন থাকে বাড়ির ছাদ। পেছনে মঞ্চে থাকত নিচু ছাদের পাঁচিল, তার ওপারে একটা ফ্লাটবাড়ির আলো। দুটি জানলা থেকে চৌকো দুটি আলো দেখা যাচ্ছে, আর মাঝখানে একটা লম্বাটে আলোর রেখা, সিঁড়ির আলো বলে বোঝা যায়। এলাকে খুন করতে এসেছে অন্তু, দলের নির্দেশে। নানা কথা হয় দুজনের মধ্যে, রাত বারোটার ঘণ্টা পড়ে, জানলাদুটির আলো নিভে যায়, শুধু মাঝবরাবর সিঁড়ির আলো জ্বলতেই থাকে। যেন এই দুটি পরস্পরের প্রতি উৎসুক নরনারী, যাদের ঘিরে আছে অনিবার্য মৃত্যু, তাদের ওপর পাহারাদারি করছে কোনো একচোখো দানব। সামনের মঞ্চে, দর্শকের ডানদিকে একটি শ্যাওলাধরা ফুলের টব, তাতে আছে ক্যাকটাস, মোটা পাতায় কঠিন, অনমনীয়, কাঁটাওয়ালা। কথা বলতে বলতে পুরনো দিনের কথা ওঠে, এলা অন্তুকে ছেড়ে বাইরে যায়, হাতে করে নিয়ে আসে মুঠো মুঠো সাদা ফুল। অন্তুর কাছে এসে সেই ফুল সে ছুঁড়ে দেয় শূন্যে। দুজনের গায়ে মাথায় এসে পড়ে সেই ফুল, গোল হয়ে চারপাশে ছড়িয়ে থাকে, অবধারিতভাবে ফুলশয্যার অনুষঙ্গ মনে পড়ে যায়।
এমন উদাহরণ আরো দেওয়া সম্ভব। তার আগে অন্য দু একটি কথা বলে নিতে হবে। শিল্পীরা জানেন, নানা ধরনের রেখা মানুষের মনে নানা ধরনের মনোভাব তৈরি করে। সোজা সরল একটি রেখা, উল্লম্ব হয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে, দেখলেই মনে আসে ঋজুতার অনুষঙ্গ। ঠিক তেমনি নীচের দিকে ঝুঁকে পড়া কোনো রেখা তৈরি করে আনুগত্য বা বশ্যতার অনুষঙ্গ। রাজা অয়দিপাউস নাটকে মূল মঞ্চের একটু পেছন থেকে তৈরি করা হত নানা আকারের কয়েক ধাপ বেদী। সেই সব বেদীর একেবারে ওপরে, মূল মঞ্চ থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে থাকত সূর্য অঙ্কিত একটি তোরণ। দেশে মড়ক দেখা দিয়েছে, তাই প্রজারা এসেছে রাজার কাছে দেশকে দুদৈর্ব থেকে মুক্ত করার প্রার্থনা জানাতে। প্রার্থীরা থাকত নিচে, মূল মঞ্চে, তাদের মাথা থাকত নিচু, আর তাদের আহ্বান শুনে অয়দিপাউস বেরিয়ে আসতেন সেই উঁচু তোরণে, দু হাত দিয়ে তোরণের দুটি থামকে স্পর্শ করে। উল্লম্ব সরলরেখার বহু নিচে থাকত প্রার্থীরা, এইভাবে রাজার মহিমার সামনে নতজানু প্রার্থীদের বিন্যস্ত করা হত।
নাটকের শেষে, সেই উঁচু তোরণ দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে নেমে আসত অসহায় অয়দিপাউস, প্রথম দৃশ্যের ঋজুতা তখন অন্তর্হিত–এইভাবে শুধু দুটি দৃশ্যের বিন্যাসে গৌরবময় অধিকার থেকে পতনের ছবি তুলে ধরা হত। আর একটি অসাারন নাট্য মুহূর্তের কথা বলতে ইচ্ছে করছে। অয়দিপাউসকে হত্যা করার জন্য যার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল সেই মেষপালকে আনা হয়েছে মঞ্চে, সে বসে আছে মূল মঞ্চে, আর তার দু ধাপ ওপরের বেদী থেকে তাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে অয়দিপাউস। চরম সত্য আবিষ্কারের ঠিক আগে মেষপালক হাহাকার করে ওঠে, রাজা, আমি যে আজ এক সর্বনাশের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি। অয়দিপাউসরূপী শম্ভু মিত্র বলতেন, আমিও যে সেই সর্বনাশের কিনারায়, বলে লাফ মারতেন বেদী থেকে, টিপে ধরতেন মেষপালকের গলা।
শুধু অভিনয় নয়, এই অংশে প্রযোজনারাও একটি কারুকাজ ছিল। বেদীর ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজাকে ধরে থাকত আলো, আর নিচে মেষপালককে , মাঝখানের অংশটি থাকত অন্ধকার। ফলে, মেষপালকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বার সময় শম্ভু মিত্র একটা অন্ধকারের স্তর পার হয়ে আসতেন, দেখে মনে হত যেন অনেক উঁচু থেকে নিচে লাফিয়ে পড়লেন তিনি। মনে হয়, এ লাফ কি কেবলমাত্র মেষপালকের গলা টিপে ধরার জন্য? আমিও এক সর্বনাশের কিনারায় বলে যখন লাফ দেন অয়দিপাউস, তখন মনে না হয়ে পারে না, সেই কিনারা থেকে তিনি যেন লাফ দিয়ে পড়লেন সর্বনাশের মধ্যে।
অয়দিপাউসের সঙ্গে একই নাট্যোৎসবে প্রযোজিত হয়েছিল রাজা। একেবারেই অন্য রকম এই নাটক, রাজা অয়দিপাউসের তুলনায় তো বটেই, এর আগে করা বহুরূপীর রবীন্দ্র প্রযোজনাগুলির থেকেও এর জাত আলাদা। চার অধ্যায় বা বিসর্জনে একটা স্পষ্ট আখ্যান আছে, রক্তকরবীতেও তাই, সেই সব নাটকে দ্বন্দ্বের ধরন কম বেশি দর্শকের অভিজ্ঞতার কাছাকাছি। রাজা কিন্তু এদের তুলনায় একেবারেই আলাদা ধাঁচের নাটক, যার সম্পর্কে রাজার কথায় নামের প্রবন্ধে শম্ভু মিত্র বলেছেন, প্রায় নিরাভরণ একটি বহু স্তরায়িত দ্বন্দ্ব আছে। সুদর্শনা আর রাজার ঘর অন্ধকার। বসন্তোৎসবের রাজপথ আলোকময়, আবার মোহ ভেঙে সত্যিকারের বাইরে চলে আসা, আলোয় চলে আসার পরের যে আলো, তার ধরন বসন্তোৎসবের থেকে তো খানিকটা আলাদাই হতে হবে।
নির্দেশক জীবনের শেষ পর্বে শম্ভু মিত্র ফিরে এসেছিলেন আধুনিক সময়ের দিকে। অন্তত তাঁর চোখে সে সময় জুড়ে ছিল অন্ধকার, যে অন্ধকারের ছবি আমরা দেখতে পাব চাঁদ বণিকের পালার মধ্যে। তখন তিনি সুস্থ নন, চোখে ভাল দেখতে পান না। তা সত্যেও কী করে ভোলা যাবে বাকি ইতিহাস নাটকে সেন্টার টেবিলের তলা থেকে বেরিয়ে আসা আলোয় শরদিন্দুর ভয়ার্তমুখ, পেছনে আত্মহননের পক্ষে সীতানাথের সওয়াল, যে আসলে সেই শরদিন্দুরই মনের চেপে দেওয়া অংশ? কী করে ভোলা যাবে পাগলা ঘোড়া নাটকের কথা, যেখানে একটিমাত্র চৌকিতে বসে থাকা মদ্যপানরত চারটি চরিত্রের বিবিধ সংস্থাপন বা কম্পোজিশনে নানা অর্থময় মূর্তি তৈরি হয়ে উঠত?
এটা আসলে একটা অর্থহীন প্রবন্ধ। নাট্য কেমন করে মঞ্চের ওপর তার ভাষা তৈরি করে, উচ্চারণযোগ্য ভাষায় সে রহস্যের বিবরণ দেওয়ার সাধ্য এই লেখকের নেই। যাঁরা এই প্রযোজনাগুলি দেখেছেন, এ লেখা শুধু তাঁদের স্মৃতিকেই উস্কে দিতে পারে।
(নাট্যমেব জয়তে পত্রিকার ১০ মার্চ ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত)
(নাট্যমেব জয়তে পত্রিকার ১০ মার্চ ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত)



0 Comments